• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> মতামত

পরিবেশ উন্নয়নে সবাই মনোযোগী হই

অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১১: ৩৪
logo

পরিবেশ উন্নয়নে সবাই মনোযোগী হই

অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১১: ৩৪
Photo

২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনলাইন সেমিনারে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার জানান মাঠ প্রশাসনের সহায়তায় তিনি বের করেছেন দেশে নদনদীর সংখ্যা ৭৭০টিরও বেশি। একজন নদী বিশেষজ্ঞের হিসেবে সংখ্যাটি ১ হাজার ১৭৮। তবে নদ-নদীর তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত আছে। সেমিনারের আলোচনায় কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা নদী রক্ষায় আইন প্রয়োগের উপর জোর দেন। তাঁদের আলোচনায় ভেসে উঠেছে দেশের সংবিধান ও সর্বোচ্চ আদালত একাধিক রায়ে নদী রক্ষায় সরকারি কর্মকর্তাদের আইনি ক্ষমতা দিয়েছেন।

কমিশনের কর্মকর্তারা একাধিকবার বলেছেন, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকগণ আইন প্রয়োগে সাহসী ভূমিকা না রাখলে নদী বাঁচানো সম্ভব হবে না। সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার জমি দখল করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হচ্ছে। জামালপুর ও নারায়নগঞ্জ জেলার নদী নিয়ে আলোচনার সময় দেশের শীর্ষ স্থানীয় কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম উচ্চারিত হয়। দক্ষিণের একটি জেলা প্রশাসনের নাম উল্লেখ করে মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, তারা নদীর প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে ঘাট তৈরি করছেন।

এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, যিনি নদী রক্ষা করবেন, তিনি নদী উদ্ধার করবেন। তিনি যদি নদী দখল করেন তবে ব্যাপারটি কি দাড়ায়? নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান আরও বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, নদ-নদীর মালিকানা ও স্বত্ত¡ জনগণের, এমনকি রাষ্ট্রেরও নয়। এই মালিকানা ও স্বত্ত¡ রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার। সাহস করে সরকারি কর্মকর্তাদের আইনের প্রয়োগ করে যেতে হবে।

সেমিনারের শেষ পর্যায়ে কমিশনের সদস্য শরমিন মুরশিদ বলেন, নদী রক্ষায়, নদী উদ্ধারে কি করতে হবে, তা আইনে বলা আছে। প্রশাসনের উচিত আইন প্রয়োগ করা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নদী দখল করেছে। এরা ফৌজদারী অপরাধ করেছে। এদের উচ্ছেদের নোটিশের পরিবর্তে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া উচিত।

নদী রক্ষা কমিশন একটি মাষ্টার প্ল্যান করেছিল যা কোভিড-১৯ এর কারণে- অনেকটা পিছিয়ে গেছে। এই মাষ্টার প্ল্যান পূর্ণদমে চালু থাকা দেশের পরিবেশ রক্ষায় অতীব প্রয়োজনীয়। তুরাগনদী রক্ষা নিয়ে উচ্চ আদালত নদীকে জীবন্ত সত্ত্বাহিসেবে রায় দিয়েছেন কিন্তু এই জীবন্ত সত্ত্বাকে যারা হত্যা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের আইন সংশোধন করে অচিরেই যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, টঙ্গী খাল ও বালু নদীগুলোর অবৈধ দখল করা জমি বহুলাংশে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নদীতে দূষণ বন্ধ করার ব্যাপারে কোন দিক নির্দেশনা নাই। এই ভয়াবহ মাত্রার দূষণের কারনে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য সিটি করপোশেনের ড্রেনের মাধ্যমে নগরের খালগুলো দিয়ে সরাসরি নদীতে নির্গত হওয়া প্রায় ২ কোটি নাগরিকের এই ঢাকা এখন একটি পয়ঃবর্জ্য বিপর্যস্ত নগরী। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ নগরীতে পর্যাপ্ত সুয়ারেজ লাইন নির্মাণে ঢাকা ওয়াসার ব্যর্থতা মহানগরী ও তার আশপাশের কলকারখানাগুলো থেকে অব্যাহতভাবে নদীগুলোতে নানা কৌশলে রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা হয়। জৈব-অজৈব বর্জ্যরে কারণে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো এমনকি শীতলক্ষা, বংশী, বালোনদীও আজ দূষণের কারণে অর্ধমৃত পরিণত হয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকাই নয়।

সমগ্র দেশের এখন এই চিত্র দেখা যায় দেশের সকল নদীরই দূষণমুক্ত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা বাঞ্ছনীয়। সেই সঙ্গে দূষণকারী সকল সংস্থা প্রতিষ্ঠানের প্রতি নদী, জলাভূমিতে দূষণ বন্ধ করার নির্দেশনা দিতে হবে। অচিরেই সকল সরকারি বেসরকারী সংস্থা যারা দূষণ কাজে ব্যস্ত থাকে তাদের সুনির্দিষ্টভাবে এ কাজ বন্ধের নির্দেশনা দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ কাজ তদারকির জন্য নদী কমিশনকে আরও লোকবল দিয়ে সাজাতে হবে। বুড়িগঙ্গা, বালু ও তুরাগ নদের সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি নদীরই সীমানা চিহ্নিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বাংলাদেশের সব নদ-নদী, জলাভূমির অভিভাবক সংস্থা হিসেবে সকল ধরনের দখল, দূষণ, নাব্যতার বিষয়ে সদা সজাগ জনসংখ্যার চাপ, উন্নয়ন কর্মকান্ড, আন্ত:দেশীয় নদীগুলোর উজান দেশে অত্যধিক পাানি প্রত্যাহার, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের নদ-নদীগুলোতে নানাহ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এসব সমস্যা চিহ্নিত করে তার যথাযথ সমাধানের জন্য সুপারিশ ও নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নিয়মিত অবহিত করে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রদত্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করলেই দখল ও দূষণ থেকে গোটা জাতি রক্ষা পেতে পারে। প্রক্রিয়াধীন বলে ফেলে রাখলে সকল নদ নদীই ইকোলজিক্যালি ডেড হয়ে যাবে। নদী মাতৃক বাংলাদেশ আর বলা যাবে না।

এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর বনভূমি দখল হয়ে গেছে। ১ লাখ ৬০ হাজার ৫৬৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান এসব বনভূমি জবরদখল করে রেখেছেন। জমি দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ, কৃষিকাজ থেকে শুরু করে কলকারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। বন বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী দখলদারদের মধ্যে ৮৮ হাজার ২১৫ জন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৩ দশমিক ০৬ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখল করেছেন। ৮২০ একর সংরক্ষিত বন দখল করে স্থায়ী স্থাপনাসহ শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা করেছেন ১৭২ জন। ৪ হাজার ৯১৪ একর বন দখল করে ৩ হাজার ৩২৯ জন গড়েছেন হাটবাজার, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কটেজ, ফার্ম, রিসোর্ট ইত্যাদি। ঘরবাড়ি করেছেন ৫৮ হাজার ৪০৭ জন। স্থায়ী স্থাপনা না করে কৃষিকাজ, বাগান ইত্যাদি করেছেন ২৬ হাজার ৩০৭ জন।

এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সরকারি বেসরকারী ও ব্যক্তি মালিকানাধীন কাজে পাহাড়-টিলা কাটা বা অন্য কোন উপায়ে ভূমিরূপ পরিবর্তন করা যাবে না বলা হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাহাড় কাটা চলছেই। ফলে পাহাড়, বন ও পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। নির্বিচারে বন ধ্বংস, বিদেশি প্রজাতির গাছের অগ্রাসন, বাণিজ্যিক বন সম্প্রসারণ ও বনবিভাগের উদাসীনতার কারণে ক্রমেই ধ্বংসের পথে প্রাকৃতিক বন।

প্রাকৃতিক বন ধ্বংসের কারণে বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ, বিনষ্ট হচ্ছে প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রতিটি গাছ পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একটি গাছকে বাঁচাতেও উন্নয়ন নকশায় পরিবর্তনের নজির আছে। ক্ষুদ্র পরিসরে বৃক্ষরোপন এবং পুনরুদ্ধার প্রকল্পও পরিবেশে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা, বায়ুদূষণ হ্রাস, পরিবেশ শীতলকরণ এবং বন থেকে অন্যান্য পরিসেবার গুণগত পরিমাণ বাড়াতে হতে পারে। বন থেকে বিশ^ব্যাপী ৮৬ কোটিরও বেশি লোকের কাজের ব্যবস্থা হয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা গেলে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে। সৃষ্টি হতে নতুন কর্মসংস্থান। বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে দরকার স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্তকরণ ও ক্ষমতায়ন। বনবাসী এবং বনজীবীদের অংশগ্রহণে সহব্যবস্থাপনা কার্যক্রম অচিরেই চালু করতে হবে।

জনতার জিজ্ঞাসা বর্জ্য কিভাবে তৈরি হয়, এটা সংগ্রহ করে কিভাবে, এটা পরিবহন করে কিভাবে এবং অপসারণ করে কিভাবে। এও তাদের জিজ্ঞাসা কিভাবে বর্জ্য থেকে ক্ষতিকারক পদার্থের তৈরি হয় ও তৈরি বন্ধ করা যায় তা কিভাবে পুন:ব্যবহার করা যায় এবং রিসাইক্লিং করা যায়। বিভিন্ন নীতি থাকা স্বত্তে¡ও তা অকার্যকর। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা হয় । তা পচে গিয়ে চতুর্দিকে দুর্গন্ধ চড়াচ্ছে। এসব থেকে বিভিন্ন রোগ জীবানু ছড়িয়ে পড়ছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি একটি হুমকি। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যও। তাই মফস্বল শহরগুলো থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত একটি বর্জ্য অপসারণ পরিকল্পিত নীতিমালা তৈরি করে সেই মতে পরিচালিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

কুমিল্লায় গোমতী নদী ও পুরান গোমতী এখন এক চরম অস্তিত্ব সংকটে। এক শ্রেণীর স্বার্থপর সুবিধাবাদী চক্র গোমতী নদী ও নদী পাড়ের মাটি প্রতিদিন কেটে লুন্ঠন করে অবৈধ ব্যবসা করছে এবং নদীর নান্দনিক সৌন্দর্যকে ক্ষত বিক্ষত করে অস্তিত্ব বিপন্ন করছে। সেই সাথে নদী পাড়ে বিনা অনুমতিতে স্থাপনা তৈরি এবং দূষণও চলছে। এক সময়ের মূল গোমতীর অংশ টিক্কারচর থেকে কাপ্তান বাজার পর্যন্ত পুরান গোমতীও দখলদারদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। দুই তীরের অবৈধ বসতিরা একটু একটু করে নদীর অংশ ভরাট করে নদী দখলে নিচ্ছে। নদীতে বাড়ির সেনিটারি লাইনে বর্জ্য নি:সরণ, ময়লা আবর্জনা ফেলে নদীর পানি ও চারপাশের পরিবেশ দুষিত করে তুলছে।

নদীর স্বকীয়তা, প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনকে স্মারকলিপি ও দাবি জানিয়ে আসছে। মাঝে মধ্যে ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা হলেও নদীর সুরক্ষায়, পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় ও সৌন্দর্যবৃদ্ধিসহ দখলমুক্ত করে নদীর সুরক্ষায় সার্বক্ষনিক বা নিয়মিত কোন তত্ত্বাবধান নাই। লাকসামের উপর দিয়ে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদী, বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার সালদা নদী, হোমনা-তিতাসের কাঁঠালিয়া নদী, মুরাদনগরের বুড়ি নদীসহ জেলার এমন সব নদীর নিয়মিত তত্ত্বাবধান ও সংরক্ষণ হচ্ছে না।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন পুরাতন গোমতীকে হাতির ঝিলের মত একটি নান্দনিক অবকাঠামো তৈরিসহ পরিচ্ছন্নতার জরুরী ব্যবস্থা নিতে দাবী জানিয়ে আসছে যাতে সকল সচেতন নাগরিক সমাজের স্বত:স্ফূর্ত সমর্থন রয়েছে। সামগ্রিক বিবরনীটির সঙ্গে জনতা ও পরিবেশবিদরাও আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবস’২৬ পালনে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন।

অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ।

Thumbnail image

২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনলাইন সেমিনারে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার জানান মাঠ প্রশাসনের সহায়তায় তিনি বের করেছেন দেশে নদনদীর সংখ্যা ৭৭০টিরও বেশি। একজন নদী বিশেষজ্ঞের হিসেবে সংখ্যাটি ১ হাজার ১৭৮। তবে নদ-নদীর তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত আছে। সেমিনারের আলোচনায় কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা নদী রক্ষায় আইন প্রয়োগের উপর জোর দেন। তাঁদের আলোচনায় ভেসে উঠেছে দেশের সংবিধান ও সর্বোচ্চ আদালত একাধিক রায়ে নদী রক্ষায় সরকারি কর্মকর্তাদের আইনি ক্ষমতা দিয়েছেন।

কমিশনের কর্মকর্তারা একাধিকবার বলেছেন, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকগণ আইন প্রয়োগে সাহসী ভূমিকা না রাখলে নদী বাঁচানো সম্ভব হবে না। সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার জমি দখল করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হচ্ছে। জামালপুর ও নারায়নগঞ্জ জেলার নদী নিয়ে আলোচনার সময় দেশের শীর্ষ স্থানীয় কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম উচ্চারিত হয়। দক্ষিণের একটি জেলা প্রশাসনের নাম উল্লেখ করে মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, তারা নদীর প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে ঘাট তৈরি করছেন।

এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, যিনি নদী রক্ষা করবেন, তিনি নদী উদ্ধার করবেন। তিনি যদি নদী দখল করেন তবে ব্যাপারটি কি দাড়ায়? নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান আরও বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, নদ-নদীর মালিকানা ও স্বত্ত¡ জনগণের, এমনকি রাষ্ট্রেরও নয়। এই মালিকানা ও স্বত্ত¡ রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার। সাহস করে সরকারি কর্মকর্তাদের আইনের প্রয়োগ করে যেতে হবে।

সেমিনারের শেষ পর্যায়ে কমিশনের সদস্য শরমিন মুরশিদ বলেন, নদী রক্ষায়, নদী উদ্ধারে কি করতে হবে, তা আইনে বলা আছে। প্রশাসনের উচিত আইন প্রয়োগ করা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নদী দখল করেছে। এরা ফৌজদারী অপরাধ করেছে। এদের উচ্ছেদের নোটিশের পরিবর্তে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া উচিত।

নদী রক্ষা কমিশন একটি মাষ্টার প্ল্যান করেছিল যা কোভিড-১৯ এর কারণে- অনেকটা পিছিয়ে গেছে। এই মাষ্টার প্ল্যান পূর্ণদমে চালু থাকা দেশের পরিবেশ রক্ষায় অতীব প্রয়োজনীয়। তুরাগনদী রক্ষা নিয়ে উচ্চ আদালত নদীকে জীবন্ত সত্ত্বাহিসেবে রায় দিয়েছেন কিন্তু এই জীবন্ত সত্ত্বাকে যারা হত্যা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের আইন সংশোধন করে অচিরেই যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, টঙ্গী খাল ও বালু নদীগুলোর অবৈধ দখল করা জমি বহুলাংশে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নদীতে দূষণ বন্ধ করার ব্যাপারে কোন দিক নির্দেশনা নাই। এই ভয়াবহ মাত্রার দূষণের কারনে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য সিটি করপোশেনের ড্রেনের মাধ্যমে নগরের খালগুলো দিয়ে সরাসরি নদীতে নির্গত হওয়া প্রায় ২ কোটি নাগরিকের এই ঢাকা এখন একটি পয়ঃবর্জ্য বিপর্যস্ত নগরী। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ নগরীতে পর্যাপ্ত সুয়ারেজ লাইন নির্মাণে ঢাকা ওয়াসার ব্যর্থতা মহানগরী ও তার আশপাশের কলকারখানাগুলো থেকে অব্যাহতভাবে নদীগুলোতে নানা কৌশলে রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা হয়। জৈব-অজৈব বর্জ্যরে কারণে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো এমনকি শীতলক্ষা, বংশী, বালোনদীও আজ দূষণের কারণে অর্ধমৃত পরিণত হয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকাই নয়।

সমগ্র দেশের এখন এই চিত্র দেখা যায় দেশের সকল নদীরই দূষণমুক্ত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা বাঞ্ছনীয়। সেই সঙ্গে দূষণকারী সকল সংস্থা প্রতিষ্ঠানের প্রতি নদী, জলাভূমিতে দূষণ বন্ধ করার নির্দেশনা দিতে হবে। অচিরেই সকল সরকারি বেসরকারী সংস্থা যারা দূষণ কাজে ব্যস্ত থাকে তাদের সুনির্দিষ্টভাবে এ কাজ বন্ধের নির্দেশনা দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ কাজ তদারকির জন্য নদী কমিশনকে আরও লোকবল দিয়ে সাজাতে হবে। বুড়িগঙ্গা, বালু ও তুরাগ নদের সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি নদীরই সীমানা চিহ্নিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বাংলাদেশের সব নদ-নদী, জলাভূমির অভিভাবক সংস্থা হিসেবে সকল ধরনের দখল, দূষণ, নাব্যতার বিষয়ে সদা সজাগ জনসংখ্যার চাপ, উন্নয়ন কর্মকান্ড, আন্ত:দেশীয় নদীগুলোর উজান দেশে অত্যধিক পাানি প্রত্যাহার, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের নদ-নদীগুলোতে নানাহ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এসব সমস্যা চিহ্নিত করে তার যথাযথ সমাধানের জন্য সুপারিশ ও নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নিয়মিত অবহিত করে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রদত্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করলেই দখল ও দূষণ থেকে গোটা জাতি রক্ষা পেতে পারে। প্রক্রিয়াধীন বলে ফেলে রাখলে সকল নদ নদীই ইকোলজিক্যালি ডেড হয়ে যাবে। নদী মাতৃক বাংলাদেশ আর বলা যাবে না।

এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর বনভূমি দখল হয়ে গেছে। ১ লাখ ৬০ হাজার ৫৬৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান এসব বনভূমি জবরদখল করে রেখেছেন। জমি দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ, কৃষিকাজ থেকে শুরু করে কলকারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। বন বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী দখলদারদের মধ্যে ৮৮ হাজার ২১৫ জন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৩ দশমিক ০৬ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখল করেছেন। ৮২০ একর সংরক্ষিত বন দখল করে স্থায়ী স্থাপনাসহ শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা করেছেন ১৭২ জন। ৪ হাজার ৯১৪ একর বন দখল করে ৩ হাজার ৩২৯ জন গড়েছেন হাটবাজার, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কটেজ, ফার্ম, রিসোর্ট ইত্যাদি। ঘরবাড়ি করেছেন ৫৮ হাজার ৪০৭ জন। স্থায়ী স্থাপনা না করে কৃষিকাজ, বাগান ইত্যাদি করেছেন ২৬ হাজার ৩০৭ জন।

এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সরকারি বেসরকারী ও ব্যক্তি মালিকানাধীন কাজে পাহাড়-টিলা কাটা বা অন্য কোন উপায়ে ভূমিরূপ পরিবর্তন করা যাবে না বলা হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাহাড় কাটা চলছেই। ফলে পাহাড়, বন ও পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। নির্বিচারে বন ধ্বংস, বিদেশি প্রজাতির গাছের অগ্রাসন, বাণিজ্যিক বন সম্প্রসারণ ও বনবিভাগের উদাসীনতার কারণে ক্রমেই ধ্বংসের পথে প্রাকৃতিক বন।

প্রাকৃতিক বন ধ্বংসের কারণে বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ, বিনষ্ট হচ্ছে প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রতিটি গাছ পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একটি গাছকে বাঁচাতেও উন্নয়ন নকশায় পরিবর্তনের নজির আছে। ক্ষুদ্র পরিসরে বৃক্ষরোপন এবং পুনরুদ্ধার প্রকল্পও পরিবেশে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা, বায়ুদূষণ হ্রাস, পরিবেশ শীতলকরণ এবং বন থেকে অন্যান্য পরিসেবার গুণগত পরিমাণ বাড়াতে হতে পারে। বন থেকে বিশ^ব্যাপী ৮৬ কোটিরও বেশি লোকের কাজের ব্যবস্থা হয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা গেলে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে। সৃষ্টি হতে নতুন কর্মসংস্থান। বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে দরকার স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্তকরণ ও ক্ষমতায়ন। বনবাসী এবং বনজীবীদের অংশগ্রহণে সহব্যবস্থাপনা কার্যক্রম অচিরেই চালু করতে হবে।

জনতার জিজ্ঞাসা বর্জ্য কিভাবে তৈরি হয়, এটা সংগ্রহ করে কিভাবে, এটা পরিবহন করে কিভাবে এবং অপসারণ করে কিভাবে। এও তাদের জিজ্ঞাসা কিভাবে বর্জ্য থেকে ক্ষতিকারক পদার্থের তৈরি হয় ও তৈরি বন্ধ করা যায় তা কিভাবে পুন:ব্যবহার করা যায় এবং রিসাইক্লিং করা যায়। বিভিন্ন নীতি থাকা স্বত্তে¡ও তা অকার্যকর। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা হয় । তা পচে গিয়ে চতুর্দিকে দুর্গন্ধ চড়াচ্ছে। এসব থেকে বিভিন্ন রোগ জীবানু ছড়িয়ে পড়ছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি একটি হুমকি। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যও। তাই মফস্বল শহরগুলো থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত একটি বর্জ্য অপসারণ পরিকল্পিত নীতিমালা তৈরি করে সেই মতে পরিচালিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

কুমিল্লায় গোমতী নদী ও পুরান গোমতী এখন এক চরম অস্তিত্ব সংকটে। এক শ্রেণীর স্বার্থপর সুবিধাবাদী চক্র গোমতী নদী ও নদী পাড়ের মাটি প্রতিদিন কেটে লুন্ঠন করে অবৈধ ব্যবসা করছে এবং নদীর নান্দনিক সৌন্দর্যকে ক্ষত বিক্ষত করে অস্তিত্ব বিপন্ন করছে। সেই সাথে নদী পাড়ে বিনা অনুমতিতে স্থাপনা তৈরি এবং দূষণও চলছে। এক সময়ের মূল গোমতীর অংশ টিক্কারচর থেকে কাপ্তান বাজার পর্যন্ত পুরান গোমতীও দখলদারদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। দুই তীরের অবৈধ বসতিরা একটু একটু করে নদীর অংশ ভরাট করে নদী দখলে নিচ্ছে। নদীতে বাড়ির সেনিটারি লাইনে বর্জ্য নি:সরণ, ময়লা আবর্জনা ফেলে নদীর পানি ও চারপাশের পরিবেশ দুষিত করে তুলছে।

নদীর স্বকীয়তা, প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনকে স্মারকলিপি ও দাবি জানিয়ে আসছে। মাঝে মধ্যে ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা হলেও নদীর সুরক্ষায়, পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় ও সৌন্দর্যবৃদ্ধিসহ দখলমুক্ত করে নদীর সুরক্ষায় সার্বক্ষনিক বা নিয়মিত কোন তত্ত্বাবধান নাই। লাকসামের উপর দিয়ে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদী, বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার সালদা নদী, হোমনা-তিতাসের কাঁঠালিয়া নদী, মুরাদনগরের বুড়ি নদীসহ জেলার এমন সব নদীর নিয়মিত তত্ত্বাবধান ও সংরক্ষণ হচ্ছে না।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন পুরাতন গোমতীকে হাতির ঝিলের মত একটি নান্দনিক অবকাঠামো তৈরিসহ পরিচ্ছন্নতার জরুরী ব্যবস্থা নিতে দাবী জানিয়ে আসছে যাতে সকল সচেতন নাগরিক সমাজের স্বত:স্ফূর্ত সমর্থন রয়েছে। সামগ্রিক বিবরনীটির সঙ্গে জনতা ও পরিবেশবিদরাও আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবস’২৬ পালনে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন।

অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

ভালো ফলাফল ও ভালো মানুষ: শিক্ষার দুই অপরিহার্য স্তম্ভ

২

পরিবেশ উন্নয়নে সবাই মনোযোগী হই

৩

আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

৪

জাতি গঠনে শিক্ষক: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

৫

আধুনিক বাংলাদেশের সাহসী নির্মাতা

সম্পর্কিত

ভালো ফলাফল ও ভালো মানুষ: শিক্ষার দুই অপরিহার্য স্তম্ভ

ভালো ফলাফল ও ভালো মানুষ: শিক্ষার দুই অপরিহার্য স্তম্ভ

১১ ঘণ্টা আগে
আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

২ দিন আগে
জাতি গঠনে শিক্ষক: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

জাতি গঠনে শিক্ষক: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

৩ দিন আগে
আধুনিক বাংলাদেশের সাহসী নির্মাতা

আধুনিক বাংলাদেশের সাহসী নির্মাতা

৭ দিন আগে