ভাস্কর মজুমদার

জঙ্গলের সব প্রাণীর জীবনেই কিছু না কিছু ঝামেলা থাকে। বাঘের চিন্তা শিকার নিয়ে, হরিণের চিন্তা বাঘ নিয়ে, পাখির চিন্তা বাসা নিয়ে। কিন্তু সেই জঙ্গলে একটি জোনাকি ছিল, যার কোনো চিন্তাই ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই নিজের পেছনে ছোট্ট বাতিটা জ্বালিয়ে বেরিয়ে পড়ত। না ছিল কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা, না ছিল রাজত্ব দখলের ইচ্ছা। অন্ধকার জঙ্গল, মাথার ওপর তারাভরা আকাশ, আর নিজের একচিলতে আলো। এতেই তার দিব্যি চলে যেত।
জোনাকির বাড়ির কাছেই থাকত এক সাপ। সাপেরও অভাব ছিল না। থাকার জন্য গর্ত আছে, খাওয়ার জন্য শিকার আছে, জঙ্গলে তার ভয়ডরও কম নয়। কিন্তু একটি জিনিস তার ছিল না। আলো। আর সেটাই ছিল তার যাবতীয় অশান্তির কারণ।
সাপটি লক্ষ করত, সন্ধ্যা হলেই জোনাকি কী আনন্দে উড়ে বেড়ায়! অন্ধকারের মধ্যে তাকে আলাদা করে চেনা যায়। কারও অনুমতি লাগে না, কারও প্রশংসার অপেক্ষা করতে হয় না। নিজের আলোয় নিজেই উজ্জ্বল।
ব্যাপারটা সাপের একেবারেই পছন্দ হচ্ছিল না। এত বড় জঙ্গলে তার মতো ভয়ংকর প্রাণী থাকতে এই সামান্য পোকাটা আবার আলো জ্বালিয়ে ঘুরে বেড়ায় কোন সাহসে!
এক রাতে আর সহ্য হলো না। সাপটি জোনাকিকে তাড়া করল। জোনাকি প্রাণপণে পালাতে লাগল। এ গাছ থেকে ও গাছ, ঝোপ থেকে পাতার আড়াল। কিন্তু সাপের নাছোড়বান্দা স্বভাব। ধরেই ছাড়বে।
শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত জোনাকি থেমে গেল। পেছনে ফিরেই দেখল, ফণা তুলে সাপ দাঁড়িয়ে।
জোনাকি বলল, ‘মহারাজ, মরতেই যখন হবে, তার আগে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেবেন?’
সাপ একটু বিরক্ত হলেও রাজি হলো।
‘আমি কি কখনো আপনার কোনো ক্ষতি করেছি?’
‘না।’
‘আপনার খাবারে ভাগ বসিয়েছি? গর্ত দখল করেছি? কিংবা আপনার চলার পথে বাধা হয়েছি?’
‘না।’
‘তাহলে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছেন কেন?’
সাপ এবার খানিক ইতস্তত করে বলল, ‘তোর ওই আলোটা আমার সহ্য হয় না। অন্ধকারে সবাই যখন অন্ধকার, তখন তুই একা জ্বলবি কেন?’
জোনাকি হয়তো অবাক হয়েছিল। সে জানতই না, তার আলো জ্বালানোর জন্যও কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে!
এই পর্যন্ত পড়ে সাপটিকে খুব খারাপ মনে হতে পারে। কিন্তু সাপের ওপর রাগ করার আগে একবার আমাদের চারপাশে তাকানো দরকার। কারণ এই গল্পের সাপ শুধু জঙ্গলেই থাকে না। মানুষের সমাজেও তার অবাধ বিচরণ। পার্থক্য শুধু এটুকু, জঙ্গলের সাপ ফণা তুলে ছোবল মারে, আর মানুষের ভেতরের সাপ অনেক সময় মিষ্টি হেসে কুশল বিনিময় করে।
আমাদের আশপাশে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের নিজের জীবনে খুব একটা অভাব নেই। সংসার আছে, চাকরি আছে, সামাজিক অবস্থান আছে, সম্মানও আছে। তবু অন্যের ভালো থাকা দেখলে তাঁদের মনটা কেমন যেন খচখচ করে। নিজের ঘরে আলো জ্বলছে কি না, সেদিকে খেয়াল নেই; পাশের বাড়ির বাতিটা এত উজ্জ্বল কেন, সেটাই তাঁদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।
ধরুন, অফিসে একজন সহকর্মী ভালো কাজ করলেন। কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রশংসা করল। ব্যস, আরেকজনের মুখের হাসি উধাও। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শুরু হলো গবেষণা। ‘আরে ভাই, ওর কাজ আর এমন কী! সবই তো লোক দেখানো।’ অথচ যিনি গবেষণা করছেন, নিজের কাজের হিসাব দিতে বললে তাঁরই ঘাম ছুটে যাবে।
আবার দেখবেন, আপনার কোনো বন্ধু জীবনে একটু এগিয়ে গেছেন। আপনি হয়তো খুশি হলেন, কিন্তু আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে হিসাবের খাতা খুলে বসলেন। কীভাবে এগোলেন, কার সাহায্যে এগোলেন, নিশ্চয়ই কোনো গোপন রহস্য আছে! যেন পৃথিবীতে পরিশ্রম, মেধা কিংবা সততার জোরে কিছু অর্জন করা একেবারেই অসম্ভব।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যাঁকে নিয়ে এত আলোচনা, তিনি হয়তো এসবের কিছুই জানেন না। তিনি নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। অথচ তাঁর অজান্তেই তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে একদল মানুষ রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে আছেন।
মানুষের মন বড় আজব কারখানা। এখানে ভালোবাসা যেমন তৈরি হয়, তেমনি তৈরি হয় হিংসা, সন্দেহ আর অকারণ বিদ্বেষ। আশ্চর্যজনকভাবে, অনেক সময় কারও ক্ষতি করার ইচ্ছা জন্মায় তাঁর কোনো অন্যায়ের কারণে নয়, বরং তাঁর ভালো গুণের কারণে। কারও সহজ-সরল স্বভাব অসহ্য লাগে, কারও জনপ্রিয়তা, কারও আত্মবিশ্বাস। এমনকি একজন মানুষ কেন এত হাসিখুশি থাকেন, সেটাও অন্যের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
অথচ আনন্দেরও কি কোনো অপরাধ আছে?
একজন সাধারণ মানুষ হয়তো অল্প আয় করেন, ছোট্ট সংসার নিয়ে থাকেন, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে চা খান, ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যান। দামি গাড়ি নেই, বিশাল বাড়ি নেই, ব্যাংকভর্তি টাকাও নেই। কিন্তু রাতে বিছানায় শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। তাঁর এই শান্তিটুকুই অনেক বিত্তবান মানুষের ঈর্ষার কারণ হতে পারে। কারণ অর্থ দিয়ে আরাম কেনা যায়, কিন্তু শান্তি কেনার দোকান আজও পৃথিবীতে খোলেনি।
তবে হিংসার একটা বিশেষ চরিত্র আছে। সে খুব কমই নিজের আসল পরিচয় দেয়। বেশির ভাগ সময় ভদ্রতার পোশাক পরে আসে। সামনে এসে বলে, ‘আপনার জন্য খুব ভালো লাগছে।’ তারপর আড়ালে গিয়ে শুরু হয় হিসাব-নিকাশ। কোথায় খুঁত পাওয়া যায়, কোন কথাটাকে ঘুরিয়ে বলা যায়, কীভাবে মানুষটার অর্জনকে একটু ছোট করা যায়!
যেন অন্যের মাথা থেকে মুকুট নামিয়ে দিতে পারলেই নিজের মাথায় রাজমুকুট উঠে যাবে।
কিন্তু এতক্ষণ অন্যদের নিয়ে কথা বলার পর একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। আমরা নিজেরা কতটা নির্দোষ?
আমরা তো সবাই নিজেকে জোনাকি ভাবতে পছন্দ করি। আমাদের আলো দেখে অন্যরা হিংসা করছে, আমাদের সাফল্য কারও সহ্য হচ্ছে না, এমন ভাবনায় নিজের সম্পর্কে বেশ একটা ভালো ধারণাও তৈরি হয়। কিন্তু কোনো বন্ধুর উন্নতির খবর শুনে আমাদের বুকের ভেতর কখনো কি হালকা মোচড় দেয়নি? পরিচিত কারও প্রশংসা শুনে মনে হয়নি, ‘এত প্রশংসার কী আছে?’ কিংবা কারও সুখের ছবি দেখে নিজের জীবনটাকে হঠাৎ একটু বিবর্ণ মনে হয়নি?
হয়েছে নিশ্চয়ই। কারও কম, কারও বেশি। পার্থক্য হলো, কেউ সেই অনুভূতিটাকে চিনতে পারেন, কেউ পারেন না। আর যিনি পারেন না, তাঁর মনের অন্ধকার একসময় নিজের অজান্তেই অন্যের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
আসলে হিংসা অনেকটা নোনা পানির মতো। যতই পান করা যায়, তৃষ্ণা ততই বাড়ে। আজ একজনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চিন্তা, কাল আরেকজনকে। আজ একজনের সম্মান অসহ্য, কাল অন্যজনের সাফল্য। এভাবে অন্যের জীবনের হিসাব মেলাতে মেলাতে নিজের জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো কখন যে হাতছাড়া হয়ে যায়, টেরও পাওয়া যায় না।
অবশ্য এটাও সত্য, সবাই আপনার প্রশংসা করবেন না, সবাই আপনার সঙ্গে একমতও হবেন না। তাই বলে সবাই হিংসুক নন। যিনি আপনার ভুল ধরিয়ে দেন, তিনি হয়তো আপনার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। আর যিনি সারাক্ষণ প্রশংসার ফুলঝুরি ছোটান, তাঁর মনেও অন্য হিসাব থাকতে পারে। মানুষের আসল পরিচয় কথায় নয়, আচরণে ধরা পড়ে। বিশেষ করে আপনি যখন সফল হন কিংবা বিপদে পড়েন, তখন।
জীবনের এই বিচিত্র নাট্যমঞ্চে আমরা কেউ জোনাকি, কেউ সাপ, আবার কখনো একই মানুষ দুই চরিত্রেই অভিনয় করি। অন্যের আচরণে আহত হলে জোনাকির কষ্ট বুঝি, আর নিজের অজান্তে কারও প্রতি হিংসা জন্মালে সাপের মনটাও আমাদের মধ্যে জেগে ওঠে।
সেখানেই মানুষের আসল পরীক্ষা।
নিজে ভালো থাকা যতটা জরুরি, অন্যের ভালো থাকা মেনে নিতে পারাটাও ততটাই বড় গুণ। কারণ পৃথিবীতে আলো কোনো সীমিত সম্পদ নয় যে একজনের ভাগে বেশি পড়লে আরেকজনের ভাগে কমে যাবে। বরং একজন মানুষের সাফল্য আরেকজনের পথ দেখাতে পারে। একজনের আনন্দ অন্যজনের জীবনেও আনন্দ ছড়াতে পারে। দরকার শুধু দেখার মতো চোখ আর গ্রহণ করার মতো মন।
জঙ্গলের সেই সাপটি হয়তো বুঝতে পারেনি, জোনাকিকে মেরে ফেললেও তার নিজের শরীরে আলো ফুটবে না। যে অন্ধকার নিয়ে সে জন্মেছে, সেই অন্ধকারেই তাকে ফিরতে হবে। শুধু জঙ্গলের একটি সুন্দর আলো হারিয়ে যাবে।
মানুষের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। কারও সম্মান নষ্ট করে নিজের সম্মান বাড়ানো যায় না। কারও সুখ কেড়ে নিয়ে নিজে সুখী হওয়া যায় না। বরং অন্যকে ছোট করতে করতে একসময় মানুষ নিজেই এত ছোট হয়ে যায় যে নিজের কাছেও আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।
তাই জীবনে কারও আলো চোখে লাগলে তাকে নিভিয়ে দেওয়ার আগে একবার ভাবা দরকার, সমস্যাটা সত্যিই তার আলোয়, নাকি আমাদের নিজের চোখে?
আর যাঁরা নিজের মতো করে আলো জ্বালিয়ে বেঁচে আছেন, তাঁদেরও মনে রাখা ভালো, সবাই সেই আলো পছন্দ করবেন না। তাতে মন খারাপ করার কিছু নেই। তবে নিজের আলো নিয়ে অহংকার করারও কারণ নেই। কারণ আলো যত সুন্দরই হোক, তা দিয়ে অন্যের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার চেয়ে পথ দেখানো অনেক বেশি মহৎ।
গল্পের সেই ছোট্ট জোনাকিটি আমাদের একটা বড় সত্য শিখিয়ে যায়। জীবনে আলোকিত হওয়ার জন্য বিশাল কিছু হওয়া লাগে না। সামান্য আলো নিয়েও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা যায়।
**কিন্তু মানুষ হওয়ার জন্য শুধু নিজের আলো থাকলেই চলে না, অন্যের আলো সহ্য করার মতো উদার মনও থাকতে হয়।**
জঙ্গলের সাপটির তো বিবেক ছিল না। তাই জোনাকির আলো তার অসহ্য লেগেছিল। আমাদের তো বিবেক আছে, শিক্ষা আছে, ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা আছে।
তাহলে অন্যের আলো দেখলে আমাদের এত গাত্রদাহ হয় কেন?
প্রশ্নটা জোনাকির নয়, সাপেরও নয়। প্রশ্নটা আমাদের সবার।
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

জঙ্গলের সব প্রাণীর জীবনেই কিছু না কিছু ঝামেলা থাকে। বাঘের চিন্তা শিকার নিয়ে, হরিণের চিন্তা বাঘ নিয়ে, পাখির চিন্তা বাসা নিয়ে। কিন্তু সেই জঙ্গলে একটি জোনাকি ছিল, যার কোনো চিন্তাই ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই নিজের পেছনে ছোট্ট বাতিটা জ্বালিয়ে বেরিয়ে পড়ত। না ছিল কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা, না ছিল রাজত্ব দখলের ইচ্ছা। অন্ধকার জঙ্গল, মাথার ওপর তারাভরা আকাশ, আর নিজের একচিলতে আলো। এতেই তার দিব্যি চলে যেত।
জোনাকির বাড়ির কাছেই থাকত এক সাপ। সাপেরও অভাব ছিল না। থাকার জন্য গর্ত আছে, খাওয়ার জন্য শিকার আছে, জঙ্গলে তার ভয়ডরও কম নয়। কিন্তু একটি জিনিস তার ছিল না। আলো। আর সেটাই ছিল তার যাবতীয় অশান্তির কারণ।
সাপটি লক্ষ করত, সন্ধ্যা হলেই জোনাকি কী আনন্দে উড়ে বেড়ায়! অন্ধকারের মধ্যে তাকে আলাদা করে চেনা যায়। কারও অনুমতি লাগে না, কারও প্রশংসার অপেক্ষা করতে হয় না। নিজের আলোয় নিজেই উজ্জ্বল।
ব্যাপারটা সাপের একেবারেই পছন্দ হচ্ছিল না। এত বড় জঙ্গলে তার মতো ভয়ংকর প্রাণী থাকতে এই সামান্য পোকাটা আবার আলো জ্বালিয়ে ঘুরে বেড়ায় কোন সাহসে!
এক রাতে আর সহ্য হলো না। সাপটি জোনাকিকে তাড়া করল। জোনাকি প্রাণপণে পালাতে লাগল। এ গাছ থেকে ও গাছ, ঝোপ থেকে পাতার আড়াল। কিন্তু সাপের নাছোড়বান্দা স্বভাব। ধরেই ছাড়বে।
শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত জোনাকি থেমে গেল। পেছনে ফিরেই দেখল, ফণা তুলে সাপ দাঁড়িয়ে।
জোনাকি বলল, ‘মহারাজ, মরতেই যখন হবে, তার আগে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেবেন?’
সাপ একটু বিরক্ত হলেও রাজি হলো।
‘আমি কি কখনো আপনার কোনো ক্ষতি করেছি?’
‘না।’
‘আপনার খাবারে ভাগ বসিয়েছি? গর্ত দখল করেছি? কিংবা আপনার চলার পথে বাধা হয়েছি?’
‘না।’
‘তাহলে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছেন কেন?’
সাপ এবার খানিক ইতস্তত করে বলল, ‘তোর ওই আলোটা আমার সহ্য হয় না। অন্ধকারে সবাই যখন অন্ধকার, তখন তুই একা জ্বলবি কেন?’
জোনাকি হয়তো অবাক হয়েছিল। সে জানতই না, তার আলো জ্বালানোর জন্যও কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে!
এই পর্যন্ত পড়ে সাপটিকে খুব খারাপ মনে হতে পারে। কিন্তু সাপের ওপর রাগ করার আগে একবার আমাদের চারপাশে তাকানো দরকার। কারণ এই গল্পের সাপ শুধু জঙ্গলেই থাকে না। মানুষের সমাজেও তার অবাধ বিচরণ। পার্থক্য শুধু এটুকু, জঙ্গলের সাপ ফণা তুলে ছোবল মারে, আর মানুষের ভেতরের সাপ অনেক সময় মিষ্টি হেসে কুশল বিনিময় করে।
আমাদের আশপাশে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের নিজের জীবনে খুব একটা অভাব নেই। সংসার আছে, চাকরি আছে, সামাজিক অবস্থান আছে, সম্মানও আছে। তবু অন্যের ভালো থাকা দেখলে তাঁদের মনটা কেমন যেন খচখচ করে। নিজের ঘরে আলো জ্বলছে কি না, সেদিকে খেয়াল নেই; পাশের বাড়ির বাতিটা এত উজ্জ্বল কেন, সেটাই তাঁদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।
ধরুন, অফিসে একজন সহকর্মী ভালো কাজ করলেন। কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রশংসা করল। ব্যস, আরেকজনের মুখের হাসি উধাও। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শুরু হলো গবেষণা। ‘আরে ভাই, ওর কাজ আর এমন কী! সবই তো লোক দেখানো।’ অথচ যিনি গবেষণা করছেন, নিজের কাজের হিসাব দিতে বললে তাঁরই ঘাম ছুটে যাবে।
আবার দেখবেন, আপনার কোনো বন্ধু জীবনে একটু এগিয়ে গেছেন। আপনি হয়তো খুশি হলেন, কিন্তু আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে হিসাবের খাতা খুলে বসলেন। কীভাবে এগোলেন, কার সাহায্যে এগোলেন, নিশ্চয়ই কোনো গোপন রহস্য আছে! যেন পৃথিবীতে পরিশ্রম, মেধা কিংবা সততার জোরে কিছু অর্জন করা একেবারেই অসম্ভব।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যাঁকে নিয়ে এত আলোচনা, তিনি হয়তো এসবের কিছুই জানেন না। তিনি নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। অথচ তাঁর অজান্তেই তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে একদল মানুষ রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে আছেন।
মানুষের মন বড় আজব কারখানা। এখানে ভালোবাসা যেমন তৈরি হয়, তেমনি তৈরি হয় হিংসা, সন্দেহ আর অকারণ বিদ্বেষ। আশ্চর্যজনকভাবে, অনেক সময় কারও ক্ষতি করার ইচ্ছা জন্মায় তাঁর কোনো অন্যায়ের কারণে নয়, বরং তাঁর ভালো গুণের কারণে। কারও সহজ-সরল স্বভাব অসহ্য লাগে, কারও জনপ্রিয়তা, কারও আত্মবিশ্বাস। এমনকি একজন মানুষ কেন এত হাসিখুশি থাকেন, সেটাও অন্যের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
অথচ আনন্দেরও কি কোনো অপরাধ আছে?
একজন সাধারণ মানুষ হয়তো অল্প আয় করেন, ছোট্ট সংসার নিয়ে থাকেন, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে চা খান, ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যান। দামি গাড়ি নেই, বিশাল বাড়ি নেই, ব্যাংকভর্তি টাকাও নেই। কিন্তু রাতে বিছানায় শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। তাঁর এই শান্তিটুকুই অনেক বিত্তবান মানুষের ঈর্ষার কারণ হতে পারে। কারণ অর্থ দিয়ে আরাম কেনা যায়, কিন্তু শান্তি কেনার দোকান আজও পৃথিবীতে খোলেনি।
তবে হিংসার একটা বিশেষ চরিত্র আছে। সে খুব কমই নিজের আসল পরিচয় দেয়। বেশির ভাগ সময় ভদ্রতার পোশাক পরে আসে। সামনে এসে বলে, ‘আপনার জন্য খুব ভালো লাগছে।’ তারপর আড়ালে গিয়ে শুরু হয় হিসাব-নিকাশ। কোথায় খুঁত পাওয়া যায়, কোন কথাটাকে ঘুরিয়ে বলা যায়, কীভাবে মানুষটার অর্জনকে একটু ছোট করা যায়!
যেন অন্যের মাথা থেকে মুকুট নামিয়ে দিতে পারলেই নিজের মাথায় রাজমুকুট উঠে যাবে।
কিন্তু এতক্ষণ অন্যদের নিয়ে কথা বলার পর একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। আমরা নিজেরা কতটা নির্দোষ?
আমরা তো সবাই নিজেকে জোনাকি ভাবতে পছন্দ করি। আমাদের আলো দেখে অন্যরা হিংসা করছে, আমাদের সাফল্য কারও সহ্য হচ্ছে না, এমন ভাবনায় নিজের সম্পর্কে বেশ একটা ভালো ধারণাও তৈরি হয়। কিন্তু কোনো বন্ধুর উন্নতির খবর শুনে আমাদের বুকের ভেতর কখনো কি হালকা মোচড় দেয়নি? পরিচিত কারও প্রশংসা শুনে মনে হয়নি, ‘এত প্রশংসার কী আছে?’ কিংবা কারও সুখের ছবি দেখে নিজের জীবনটাকে হঠাৎ একটু বিবর্ণ মনে হয়নি?
হয়েছে নিশ্চয়ই। কারও কম, কারও বেশি। পার্থক্য হলো, কেউ সেই অনুভূতিটাকে চিনতে পারেন, কেউ পারেন না। আর যিনি পারেন না, তাঁর মনের অন্ধকার একসময় নিজের অজান্তেই অন্যের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
আসলে হিংসা অনেকটা নোনা পানির মতো। যতই পান করা যায়, তৃষ্ণা ততই বাড়ে। আজ একজনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চিন্তা, কাল আরেকজনকে। আজ একজনের সম্মান অসহ্য, কাল অন্যজনের সাফল্য। এভাবে অন্যের জীবনের হিসাব মেলাতে মেলাতে নিজের জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো কখন যে হাতছাড়া হয়ে যায়, টেরও পাওয়া যায় না।
অবশ্য এটাও সত্য, সবাই আপনার প্রশংসা করবেন না, সবাই আপনার সঙ্গে একমতও হবেন না। তাই বলে সবাই হিংসুক নন। যিনি আপনার ভুল ধরিয়ে দেন, তিনি হয়তো আপনার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। আর যিনি সারাক্ষণ প্রশংসার ফুলঝুরি ছোটান, তাঁর মনেও অন্য হিসাব থাকতে পারে। মানুষের আসল পরিচয় কথায় নয়, আচরণে ধরা পড়ে। বিশেষ করে আপনি যখন সফল হন কিংবা বিপদে পড়েন, তখন।
জীবনের এই বিচিত্র নাট্যমঞ্চে আমরা কেউ জোনাকি, কেউ সাপ, আবার কখনো একই মানুষ দুই চরিত্রেই অভিনয় করি। অন্যের আচরণে আহত হলে জোনাকির কষ্ট বুঝি, আর নিজের অজান্তে কারও প্রতি হিংসা জন্মালে সাপের মনটাও আমাদের মধ্যে জেগে ওঠে।
সেখানেই মানুষের আসল পরীক্ষা।
নিজে ভালো থাকা যতটা জরুরি, অন্যের ভালো থাকা মেনে নিতে পারাটাও ততটাই বড় গুণ। কারণ পৃথিবীতে আলো কোনো সীমিত সম্পদ নয় যে একজনের ভাগে বেশি পড়লে আরেকজনের ভাগে কমে যাবে। বরং একজন মানুষের সাফল্য আরেকজনের পথ দেখাতে পারে। একজনের আনন্দ অন্যজনের জীবনেও আনন্দ ছড়াতে পারে। দরকার শুধু দেখার মতো চোখ আর গ্রহণ করার মতো মন।
জঙ্গলের সেই সাপটি হয়তো বুঝতে পারেনি, জোনাকিকে মেরে ফেললেও তার নিজের শরীরে আলো ফুটবে না। যে অন্ধকার নিয়ে সে জন্মেছে, সেই অন্ধকারেই তাকে ফিরতে হবে। শুধু জঙ্গলের একটি সুন্দর আলো হারিয়ে যাবে।
মানুষের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। কারও সম্মান নষ্ট করে নিজের সম্মান বাড়ানো যায় না। কারও সুখ কেড়ে নিয়ে নিজে সুখী হওয়া যায় না। বরং অন্যকে ছোট করতে করতে একসময় মানুষ নিজেই এত ছোট হয়ে যায় যে নিজের কাছেও আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।
তাই জীবনে কারও আলো চোখে লাগলে তাকে নিভিয়ে দেওয়ার আগে একবার ভাবা দরকার, সমস্যাটা সত্যিই তার আলোয়, নাকি আমাদের নিজের চোখে?
আর যাঁরা নিজের মতো করে আলো জ্বালিয়ে বেঁচে আছেন, তাঁদেরও মনে রাখা ভালো, সবাই সেই আলো পছন্দ করবেন না। তাতে মন খারাপ করার কিছু নেই। তবে নিজের আলো নিয়ে অহংকার করারও কারণ নেই। কারণ আলো যত সুন্দরই হোক, তা দিয়ে অন্যের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার চেয়ে পথ দেখানো অনেক বেশি মহৎ।
গল্পের সেই ছোট্ট জোনাকিটি আমাদের একটা বড় সত্য শিখিয়ে যায়। জীবনে আলোকিত হওয়ার জন্য বিশাল কিছু হওয়া লাগে না। সামান্য আলো নিয়েও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা যায়।
**কিন্তু মানুষ হওয়ার জন্য শুধু নিজের আলো থাকলেই চলে না, অন্যের আলো সহ্য করার মতো উদার মনও থাকতে হয়।**
জঙ্গলের সাপটির তো বিবেক ছিল না। তাই জোনাকির আলো তার অসহ্য লেগেছিল। আমাদের তো বিবেক আছে, শিক্ষা আছে, ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা আছে।
তাহলে অন্যের আলো দেখলে আমাদের এত গাত্রদাহ হয় কেন?
প্রশ্নটা জোনাকির নয়, সাপেরও নয়। প্রশ্নটা আমাদের সবার।
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।