ভাস্কর মজুমদার

কুমিল্লার ধর্মসাগরের জল কি আজও সেই বৃদ্ধ মানুষটির কথা মনে রেখেছে? যে মানুষটি একদিন এই শহরের পথ ধরে হেঁটে যেতেন, মানুষের দুঃখের কথা শুনতেন, গরিব মক্কেলের মামলা লড়তেন, প্রয়োজন হলে নিজের পকেট থেকে বাড়ি ফেরার ভাড়াটুকুও দিয়ে দিতেন। সেই মানুষটিকে একদিন তাঁর নিজের শহর থেকেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি আর ফিরে আসেননি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যে মানুষটিকে হত্যা করা হয়েছিল তাঁর কণ্ঠস্বর চিরতরে থামিয়ে দেওয়ার জন্য, আজ বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন সেই কণ্ঠস্বরের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। আমরা বাংলায় কথা বলি, বাংলায় মাকে ডাকি, ভালোবাসার কথা বলি, অভিমান করি, সন্তানকে ঘুম পাড়াই। কিন্তু কতবার মনে করি সেই মানুষটির কথা, যিনি একদিন পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে দাবি তুলেছিলেন, এই বাংলাকেও তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হবে? মানুষটির নাম **ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।** আমাদের কুমিল্লার গর্ব। বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম পথিকৃৎ। যে মানুষটি সমগ্র পাকিস্তানের গণপরিষদে কুমিল্লার এক বাঙালির সাহসী কণ্ঠকে পৌঁছে দিয়েছিলেন, সেই মানুষটির শেষ আশ্রয়টুকুও দিতে পারেনি তাঁর প্রিয় কুমিল্লা।
গল্পটা শুরু করা যাক এক অন্ধকার রাত থেকে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস। কুমিল্লা শহর তখন আতঙ্কে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। রাস্তাঘাট নীরব, মানুষের চোখে ভয়। পাকিস্তানি সেনাদের বুটের শব্দ যেন বাতাসেও শোনা যায়। ধর্মসাগরপাড়ের একটি বাড়িতে বসে আছেন প্রায় পঁচাশি বছরের এক বৃদ্ধ। তিনি জানেন, বিপদ আসছে। চাইলেই হয়তো পালানোর চেষ্টা করতে পারতেন। সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে পারতেন। তাঁর পরিচিতি ছিল, রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল, মানুষ তাঁকে ভালোবাসত। কিন্তু তিনি থেকে গেলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, তাঁকে না পেলে পাকিস্তানি সেনারা হয়তো আশপাশের নিরীহ মানুষের ওপর প্রতিশোধ নেবে। একবার ভাবুন তো! একজন মানুষ জানেন, তাঁকে হত্যা করা হতে পারে। তাঁর সামনে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও আছে। অথচ তিনি নিজের জীবন রক্ষার চেয়ে অন্য মানুষের নিরাপত্তাকে বড় করে দেখলেন। দেশপ্রেম কি শুধু পতাকা হাতে মিছিল করার নাম? নাকি দেশপ্রেম কখনো কখনো এমন এক নিঃশব্দ সিদ্ধান্ত, যেখানে একজন বৃদ্ধ নিজের মৃত্যুর সম্ভাবনা মেনে নিয়েও নিজের মাটি ছেড়ে যান না?
২৯ মার্চের সেই ভয়াবহ রাতের শুরুতে পাকিস্তানি সেনারা তাঁর বাড়িতে আসে। তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকেও। একটি পরিবার থেকে একসঙ্গে হারিয়ে যান বাবা আর ছেলে। সেই রাতের পর তাঁদের কেউ আর বাড়ি ফেরেননি। কল্পনা করুন, বাড়ির দরজাটা হয়তো আরও অনেক দিন খোলা হয়েছিল। কোনো পরিচিত পায়ের শব্দে হয়তো কারও বুক কেঁপে উঠেছিল। হয়তো কেউ ভেবেছিলেন, এই বুঝি ফিরে এলেন বাবা। কিন্তু কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ হয় না। কিছু দরজা সারা জীবন খোলা থাকলেও, যাঁর জন্য খোলা থাকে, তিনি আর ফিরে আসেন না।
অথচ এই বৃদ্ধের অপরাধটা কী ছিল? সেই অপরাধের উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে আরও তেইশ বছর আগে। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের গণপরিষদ, করাচি। দেশ ভাগ হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগে। নতুন রাষ্ট্র, নতুন ক্ষমতা, নতুন শাসক। কিন্তু জন্মের শুরুতেই সেই রাষ্ট্র তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে নারাজ। গণপরিষদে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার দাবি নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন এক বাঙালি প্রতিনিধি। তাঁর নাম ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। চারপাশে ক্ষমতাবান মানুষেরা। অনেকেই তাঁর বক্তব্যের বিরোধী। তিনি জানতেন, তাঁর প্রস্তাব হয়তো গ্রহণ করা হবে না। তবু তিনি বললেন। যুক্তি দিলেন, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাংলাভাষী। তাহলে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা কেন অবহেলিত থাকবে? প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সেই বক্তব্য পাকিস্তানের শাসকদের সামনে বাঙালির ভাষার অধিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছিল।
সেদিন হয়তো ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নিজেও জানতেন না, তাঁর উচ্চারিত দাবিটি একদিন একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের ইতিহাসে কত বড় জায়গা করে নেবে। একটি প্রস্তাব বাতিল হয়েছিল, কিন্তু একটি প্রশ্ন আর বাতিল করা যায়নি। **আমার ভাষা যদি আমার রাষ্ট্রে মর্যাদা না পায়, তাহলে সেই রাষ্ট্রে আমার মর্যাদা কোথায়?** এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মনে। ছাত্রদের প্রতিবাদ, রাজপথের আন্দোলন, বায়ান্নর রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারি, তারপর দীর্ঘ স্বাধিকার সংগ্রাম। একদিন সেই পথ গিয়ে মিশে যায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একা ভাষা আন্দোলন সৃষ্টি করেননি। ইতিহাসে আরও অসংখ্য মানুষের অবদান রয়েছে। কিন্তু তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম, যাঁরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় শুরুতেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভায় বাংলা ভাষার ন্যায্য অধিকার দাবি করার সাহস দেখিয়েছিলেন। আর সেই সাহসের মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও।
ফিরে আসি ১৯৭১ সালে। কুমিল্লা সেনানিবাসের অন্ধকারে বন্দি সেই বৃদ্ধ মানুষটির কাছে। যে হাত একদিন আদালতে ন্যায়বিচারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে, যে হাত গরিব মানুষের সাহায্যে এগিয়ে গেছে, যে হাত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছে, সেই হাত আজ অসহায়। তাঁর ওপর চলছিল অমানবিক নির্যাতন। সেনানিবাসে কর্মরত ক্ষৌরকার রমণীমোহন শীল পরবর্তী সময়ে যে অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, তা পড়তে গেলে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। তিনি দেখেছিলেন, একসময়ের সেই প্রবল ব্যক্তিত্বের মানুষটি এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার শক্তিও তাঁর অবশিষ্ট ছিল না। প্রস্রাব করতে যাওয়ার জন্য তাঁকে অত্যন্ত কষ্টে হামাগুড়ি দিতে হয়েছিল। ক্ষতবিক্ষত শরীর, মাথায় ব্যান্ডেজ, অসহায় অবস্থায় তাঁকে দেখে রমণীমোহন শীলও কিছু করতে পারেননি। এক পাকিস্তানি সেনা তাঁকে সেদিকে না তাকিয়ে নিজের কাজে মন দিতে বলেছিল।
এই দৃশ্যটি একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন। যিনি একদিন পাকিস্তানের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে কোটি মানুষের ভাষার অধিকার দাবি করেছিলেন, সেই মানুষটি আজ মাটিতে হামাগুড়ি দিচ্ছেন। যিনি অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি, তাঁর শরীরকে আজ নির্যাতনে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যিনি একটি জাতির মর্যাদার কথা বলেছিলেন, তাঁর নিজের মানবিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। একজন বৃদ্ধ মানুষ, একটি ক্ষতবিক্ষত শরীর, একটি অন্ধকার সেনানিবাস। আর বাইরে অপেক্ষা করছে একটি জাতির স্বাধীনতা। এর চেয়ে করুণ দৃশ্য কি ইতিহাস খুব বেশি দেখেছে?
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। পাকিস্তানি সেনারা কেন এত ভয় পেত এই বৃদ্ধ মানুষটিকে? তাঁর হাতে অস্ত্র ছিল না, কোনো সেনাবাহিনী ছিল না, যুদ্ধ করার মতো বয়স কিংবা শারীরিক শক্তিও ছিল না। তাঁর ছিল কেবল একটি বিশ্বাস। বাংলা ভাষা মাথা উঁচু করে বাঁচবে। বাঙালি নিজের অধিকার নিয়ে বাঁচবে। আর স্বৈরশাসকের কাছে কখনো কখনো একটি নির্ভীক বিশ্বাস হাজার অস্ত্রের চেয়েও ভয়ংকর। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবনের শেষ মুহূর্ত ও হত্যার সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক বিবরণে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু এই সত্য নিয়ে সন্দেহ নেই যে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি হওয়ার পর নির্যাতনের মধ্য দিয়েই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মরদেহও পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি।
কী নিষ্ঠুর পরিহাস! যে মানুষটি একটি জাতিকে নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছিলেন, সেই মানুষটির শেষ কথাগুলোও আমরা জানতে পারিনি। কী বলতে চেয়েছিলেন তিনি মৃত্যুর আগে? মায়ের কথা? সন্তানের কথা? কুমিল্লার কথা? নাকি শেষ মুহূর্তেও তাঁর মনে ছিল সেই বাংলা, যার মর্যাদার জন্য তিনি সারা জীবন লড়েছেন? আমরা জানি না। আর এই না জানাটুকুই বোধ হয় আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর বেদনা।
তারপর একদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। লাল সবুজের পতাকা উড়ল। মানুষ বিজয়ের আনন্দে কাঁদল। মায়ের ভাষায় স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত গাওয়া হলো। কিন্তু কুমিল্লার সেই বাড়িতে আর ফিরে এলেন না ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ফিরলেন না তাঁর সন্তানও। একটি দেশ স্বাধীন হলো, অথচ সেই স্বাধীনতার অন্যতম অগ্রপথিক নিজের চোখে দেখে যেতে পারলেন না বিজয়ের সকাল। আমি কখনো কখনো ভাবি, আজ যদি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বেঁচে থাকতেন, তাহলে কী দেখতেন? দেখতেন, তাঁর প্রিয় বাংলা আজ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভাষা। দেখতেন, যে কুমিল্লার মাটি তাঁকে আপন করে নিয়েছিল, সেই শহরের মানুষ আজও তাঁর নাম শ্রদ্ধায় উচ্চারণ করে। কিন্তু সেই সঙ্গে হয়তো আরও কিছু দৃশ্য তাঁকে কষ্ট দিত। যখন ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়, যখন সত্য বলার সাহস কমে যায়, যখন মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে ক্ষমতা ধরে রাখাই বড় হয়ে ওঠে, তখন কি আমরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্বপ্নের বাংলাদেশ থেকে দূরে সরে যাই না?
আমার কাছে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত শুধু ইতিহাসের একজন নেতা নন। তিনি আমাদের কুমিল্লার এমন এক অভিভাবক, যিনি নিজের জীবন দিয়ে শিখিয়ে গেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে বয়স লাগে না, ক্ষমতা লাগে না, প্রয়োজন শুধু একটি সৎ বিবেক। কুমিল্লার মানুষ হিসেবে আমাদের গর্বের অনেক কিছু আছে। আমাদের ইতিহাস আছে, সাহিত্য আছে, সংস্কৃতি আছে, অসংখ্য কীর্তিমান মানুষের স্মৃতি আছে। কিন্তু যখন ভাবি, এই শহরেরই এক প্রবীণ মানুষ পাকিস্তানের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে কোটি বাঙালির ভাষার মর্যাদার দাবি তুলেছিলেন, তখন কুমিল্লার সন্তান হিসেবে বুকটা অন্যরকম গর্বে ভরে ওঠে। আবার যখন ভাবি, সেই মানুষটিকেই একদিন এই শহর থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল, তখন সেই গর্বের সঙ্গে মিশে যায় এক অসহনীয় বেদনা।
আমরা তাঁর জন্য একটি কবরও পাইনি, যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারব, ধীরেনবাবু, আমরা আপনাকে ভুলিনি।
তাঁর স্মরণে সড়ক আছে, স্থাপনা আছে, সম্মাননা আছে। কিন্তু তাঁর আদর্শ আমাদের সমাজে কতটা বেঁচে আছে, সেটাই আজ বড় প্রশ্ন। আমরা কি আমাদের সন্তানদের ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের গল্প শোনাই? আমরা কি তাদের বলি, বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এই মানুষটির কী অসামান্য অবদান? আমরা কি শেখাই, দেশকে ভালোবাসার অর্থ শুধু তার ভালো দিকগুলো নিয়ে গর্ব করা নয়, বরং দেশের অন্যায়, অবিচার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো? যদি না শেখাই, তাহলে শুধু একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিয়ে আর স্বাধীনতা দিবসে পতাকা উড়িয়ে আমরা ইতিহাসের ঋণ শোধ করতে পারব না।
আজ ধর্মসাগরের পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখনো যদি মনে হয়, এই পথ দিয়েই একদিন হেঁটে যেতেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, একটু থামবেন। কল্পনা করবেন, এক বৃদ্ধ মানুষ ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। হয়তো কোনো অসহায় মানুষ তাঁর কাছে এসে সাহায্য চাইছেন। তিনি থামছেন, কথা শুনছেন, আশ্বাস দিচ্ছেন। তারপর মনে করবেন সেই অন্য দৃশ্যটি। ময়নামতীর সেনানিবাসে সেই মানুষটিই একদিন অসহায়ভাবে হামাগুড়ি দিচ্ছেন। যে মানুষটি একটি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের শরীরটুকুকে দাঁড়ানোর শক্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এরপরও যদি বুকের ভেতরটা হু হু করে না ওঠে, তাহলে আমাদের নিজেদের বিবেককে একবার প্রশ্ন করা উচিত। আমরা কি সত্যিই আমাদের ইতিহাসকে অনুভব করি, নাকি শুধু মুখস্থ করি?
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর। তাঁর জন্মদিন আসে, চলে যায়। আমরা অনেকেই হয়তো খেয়ালও করি না। অথচ কত জন্মদিন, কত মৃত্যুদিন, কত রাজনৈতিক আয়োজন নিয়ে আমাদের ব্যস্ততা! যে মানুষটির সাহসী উচ্চারণ আমাদের ভাষার সংগ্রামের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছে, তাঁর জন্য আমাদের সময় এত কম কেন? আজ আমার কুমিল্লার কাছে, আমার বাংলাদেশের কাছে একটাই আবেদন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে শুধু ইতিহাসের একটি নাম কিংবা পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি লাইনের মধ্যে আটকে রাখবেন না। তাঁকে আমাদের সন্তানের কাছে পৌঁছে দিন। তাঁর জীবন, সাহস, আত্মত্যাগ আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার গল্প শোনান। কারণ যে জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মত্যাগের কথা ভুলে যায়, একদিন সেই জাতি নিজের আত্মপরিচয়ও হারিয়ে ফেলার ঝুঁকিতে পড়ে।
আর সবশেষে ধীরেনবাবুকে একটি কথা বলতে ইচ্ছে করে।
ধীরেনবাবু, আপনি যে বাংলার জন্য কথা বলেছিলেন, সেই বাংলা আজ স্বাধীন। আপনি যে ভাষার মর্যাদা চেয়েছিলেন, সেই ভাষায় আজ আমরা কথা বলি, গান গাই, কবিতা লিখি, ভালোবাসি। আপনি যে পতাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই পতাকা আজ আমাদের আকাশে ওড়ে। কিন্তু আপনি যে মানবিক, মর্যাদাপূর্ণ, বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন আমরা কতটুকু পূরণ করতে পেরেছি, তার উত্তর দিতে আজও আমাদের সংকোচ হয়। ক্ষমা চাইব না, কারণ শুধু ক্ষমা চেয়ে ইতিহাসের ঋণ শোধ হয় না। বরং প্রতিজ্ঞা করতে চাই, এই বাংলাদেশে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যেন আর কাউকে এমন নির্মম পরিণতি বরণ করতে না হয়। সত্য বলার জন্য যেন আর কোনো মানুষকে জীবন দিতে না হয়। আর কোনো ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে যেন নিজের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে এমন করুণ পরিণতি বরণ করতে না হয়।
**ধীরেনবাবু, আপনার কবরের ঠিকানা আমরা জানি না। কিন্তু এই বাংলার প্রতিটি উচ্চারিত শব্দে আপনার সংগ্রামের ইতিহাস বেঁচে আছে।**
আপনি ফিরে আসেননি। কিন্তু আপনার ভাষা ফিরে পেয়েছে তার অধিকার। আপনার শরীরকে মাটিতে নামিয়ে আনা হয়েছিল, কিন্তু আপনার বিশ্বাসকে কেউ মাথা নত করাতে পারেনি।
আর তাই কুমিল্লার ধর্মসাগরের জল যখন বাতাসে কেঁপে ওঠে, আমার মনে হয়, ইতিহাসের গভীর থেকে আজও কেউ যেন আমাদের জিজ্ঞেস করেন,
যে বাংলার জন্য আমি জীবন দিলাম, সেই বাংলায় তোমরা সবাই ভালো আছ তো?”
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস কি আমাদের আছে?
ভাস্কর মজুমদার: আড়ংয়ের মহাব্যবস্থাপক।

কুমিল্লার ধর্মসাগরের জল কি আজও সেই বৃদ্ধ মানুষটির কথা মনে রেখেছে? যে মানুষটি একদিন এই শহরের পথ ধরে হেঁটে যেতেন, মানুষের দুঃখের কথা শুনতেন, গরিব মক্কেলের মামলা লড়তেন, প্রয়োজন হলে নিজের পকেট থেকে বাড়ি ফেরার ভাড়াটুকুও দিয়ে দিতেন। সেই মানুষটিকে একদিন তাঁর নিজের শহর থেকেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি আর ফিরে আসেননি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যে মানুষটিকে হত্যা করা হয়েছিল তাঁর কণ্ঠস্বর চিরতরে থামিয়ে দেওয়ার জন্য, আজ বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন সেই কণ্ঠস্বরের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। আমরা বাংলায় কথা বলি, বাংলায় মাকে ডাকি, ভালোবাসার কথা বলি, অভিমান করি, সন্তানকে ঘুম পাড়াই। কিন্তু কতবার মনে করি সেই মানুষটির কথা, যিনি একদিন পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে দাবি তুলেছিলেন, এই বাংলাকেও তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হবে? মানুষটির নাম **ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।** আমাদের কুমিল্লার গর্ব। বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম পথিকৃৎ। যে মানুষটি সমগ্র পাকিস্তানের গণপরিষদে কুমিল্লার এক বাঙালির সাহসী কণ্ঠকে পৌঁছে দিয়েছিলেন, সেই মানুষটির শেষ আশ্রয়টুকুও দিতে পারেনি তাঁর প্রিয় কুমিল্লা।
গল্পটা শুরু করা যাক এক অন্ধকার রাত থেকে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস। কুমিল্লা শহর তখন আতঙ্কে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। রাস্তাঘাট নীরব, মানুষের চোখে ভয়। পাকিস্তানি সেনাদের বুটের শব্দ যেন বাতাসেও শোনা যায়। ধর্মসাগরপাড়ের একটি বাড়িতে বসে আছেন প্রায় পঁচাশি বছরের এক বৃদ্ধ। তিনি জানেন, বিপদ আসছে। চাইলেই হয়তো পালানোর চেষ্টা করতে পারতেন। সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে পারতেন। তাঁর পরিচিতি ছিল, রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল, মানুষ তাঁকে ভালোবাসত। কিন্তু তিনি থেকে গেলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, তাঁকে না পেলে পাকিস্তানি সেনারা হয়তো আশপাশের নিরীহ মানুষের ওপর প্রতিশোধ নেবে। একবার ভাবুন তো! একজন মানুষ জানেন, তাঁকে হত্যা করা হতে পারে। তাঁর সামনে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও আছে। অথচ তিনি নিজের জীবন রক্ষার চেয়ে অন্য মানুষের নিরাপত্তাকে বড় করে দেখলেন। দেশপ্রেম কি শুধু পতাকা হাতে মিছিল করার নাম? নাকি দেশপ্রেম কখনো কখনো এমন এক নিঃশব্দ সিদ্ধান্ত, যেখানে একজন বৃদ্ধ নিজের মৃত্যুর সম্ভাবনা মেনে নিয়েও নিজের মাটি ছেড়ে যান না?
২৯ মার্চের সেই ভয়াবহ রাতের শুরুতে পাকিস্তানি সেনারা তাঁর বাড়িতে আসে। তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকেও। একটি পরিবার থেকে একসঙ্গে হারিয়ে যান বাবা আর ছেলে। সেই রাতের পর তাঁদের কেউ আর বাড়ি ফেরেননি। কল্পনা করুন, বাড়ির দরজাটা হয়তো আরও অনেক দিন খোলা হয়েছিল। কোনো পরিচিত পায়ের শব্দে হয়তো কারও বুক কেঁপে উঠেছিল। হয়তো কেউ ভেবেছিলেন, এই বুঝি ফিরে এলেন বাবা। কিন্তু কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ হয় না। কিছু দরজা সারা জীবন খোলা থাকলেও, যাঁর জন্য খোলা থাকে, তিনি আর ফিরে আসেন না।
অথচ এই বৃদ্ধের অপরাধটা কী ছিল? সেই অপরাধের উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে আরও তেইশ বছর আগে। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের গণপরিষদ, করাচি। দেশ ভাগ হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগে। নতুন রাষ্ট্র, নতুন ক্ষমতা, নতুন শাসক। কিন্তু জন্মের শুরুতেই সেই রাষ্ট্র তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে নারাজ। গণপরিষদে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার দাবি নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন এক বাঙালি প্রতিনিধি। তাঁর নাম ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। চারপাশে ক্ষমতাবান মানুষেরা। অনেকেই তাঁর বক্তব্যের বিরোধী। তিনি জানতেন, তাঁর প্রস্তাব হয়তো গ্রহণ করা হবে না। তবু তিনি বললেন। যুক্তি দিলেন, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাংলাভাষী। তাহলে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা কেন অবহেলিত থাকবে? প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সেই বক্তব্য পাকিস্তানের শাসকদের সামনে বাঙালির ভাষার অধিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছিল।
সেদিন হয়তো ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নিজেও জানতেন না, তাঁর উচ্চারিত দাবিটি একদিন একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের ইতিহাসে কত বড় জায়গা করে নেবে। একটি প্রস্তাব বাতিল হয়েছিল, কিন্তু একটি প্রশ্ন আর বাতিল করা যায়নি। **আমার ভাষা যদি আমার রাষ্ট্রে মর্যাদা না পায়, তাহলে সেই রাষ্ট্রে আমার মর্যাদা কোথায়?** এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মনে। ছাত্রদের প্রতিবাদ, রাজপথের আন্দোলন, বায়ান্নর রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারি, তারপর দীর্ঘ স্বাধিকার সংগ্রাম। একদিন সেই পথ গিয়ে মিশে যায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একা ভাষা আন্দোলন সৃষ্টি করেননি। ইতিহাসে আরও অসংখ্য মানুষের অবদান রয়েছে। কিন্তু তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম, যাঁরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় শুরুতেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভায় বাংলা ভাষার ন্যায্য অধিকার দাবি করার সাহস দেখিয়েছিলেন। আর সেই সাহসের মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও।
ফিরে আসি ১৯৭১ সালে। কুমিল্লা সেনানিবাসের অন্ধকারে বন্দি সেই বৃদ্ধ মানুষটির কাছে। যে হাত একদিন আদালতে ন্যায়বিচারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে, যে হাত গরিব মানুষের সাহায্যে এগিয়ে গেছে, যে হাত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছে, সেই হাত আজ অসহায়। তাঁর ওপর চলছিল অমানবিক নির্যাতন। সেনানিবাসে কর্মরত ক্ষৌরকার রমণীমোহন শীল পরবর্তী সময়ে যে অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, তা পড়তে গেলে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। তিনি দেখেছিলেন, একসময়ের সেই প্রবল ব্যক্তিত্বের মানুষটি এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার শক্তিও তাঁর অবশিষ্ট ছিল না। প্রস্রাব করতে যাওয়ার জন্য তাঁকে অত্যন্ত কষ্টে হামাগুড়ি দিতে হয়েছিল। ক্ষতবিক্ষত শরীর, মাথায় ব্যান্ডেজ, অসহায় অবস্থায় তাঁকে দেখে রমণীমোহন শীলও কিছু করতে পারেননি। এক পাকিস্তানি সেনা তাঁকে সেদিকে না তাকিয়ে নিজের কাজে মন দিতে বলেছিল।
এই দৃশ্যটি একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন। যিনি একদিন পাকিস্তানের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে কোটি মানুষের ভাষার অধিকার দাবি করেছিলেন, সেই মানুষটি আজ মাটিতে হামাগুড়ি দিচ্ছেন। যিনি অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি, তাঁর শরীরকে আজ নির্যাতনে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যিনি একটি জাতির মর্যাদার কথা বলেছিলেন, তাঁর নিজের মানবিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। একজন বৃদ্ধ মানুষ, একটি ক্ষতবিক্ষত শরীর, একটি অন্ধকার সেনানিবাস। আর বাইরে অপেক্ষা করছে একটি জাতির স্বাধীনতা। এর চেয়ে করুণ দৃশ্য কি ইতিহাস খুব বেশি দেখেছে?
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। পাকিস্তানি সেনারা কেন এত ভয় পেত এই বৃদ্ধ মানুষটিকে? তাঁর হাতে অস্ত্র ছিল না, কোনো সেনাবাহিনী ছিল না, যুদ্ধ করার মতো বয়স কিংবা শারীরিক শক্তিও ছিল না। তাঁর ছিল কেবল একটি বিশ্বাস। বাংলা ভাষা মাথা উঁচু করে বাঁচবে। বাঙালি নিজের অধিকার নিয়ে বাঁচবে। আর স্বৈরশাসকের কাছে কখনো কখনো একটি নির্ভীক বিশ্বাস হাজার অস্ত্রের চেয়েও ভয়ংকর। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবনের শেষ মুহূর্ত ও হত্যার সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক বিবরণে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু এই সত্য নিয়ে সন্দেহ নেই যে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি হওয়ার পর নির্যাতনের মধ্য দিয়েই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মরদেহও পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি।
কী নিষ্ঠুর পরিহাস! যে মানুষটি একটি জাতিকে নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছিলেন, সেই মানুষটির শেষ কথাগুলোও আমরা জানতে পারিনি। কী বলতে চেয়েছিলেন তিনি মৃত্যুর আগে? মায়ের কথা? সন্তানের কথা? কুমিল্লার কথা? নাকি শেষ মুহূর্তেও তাঁর মনে ছিল সেই বাংলা, যার মর্যাদার জন্য তিনি সারা জীবন লড়েছেন? আমরা জানি না। আর এই না জানাটুকুই বোধ হয় আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর বেদনা।
তারপর একদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। লাল সবুজের পতাকা উড়ল। মানুষ বিজয়ের আনন্দে কাঁদল। মায়ের ভাষায় স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত গাওয়া হলো। কিন্তু কুমিল্লার সেই বাড়িতে আর ফিরে এলেন না ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ফিরলেন না তাঁর সন্তানও। একটি দেশ স্বাধীন হলো, অথচ সেই স্বাধীনতার অন্যতম অগ্রপথিক নিজের চোখে দেখে যেতে পারলেন না বিজয়ের সকাল। আমি কখনো কখনো ভাবি, আজ যদি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বেঁচে থাকতেন, তাহলে কী দেখতেন? দেখতেন, তাঁর প্রিয় বাংলা আজ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভাষা। দেখতেন, যে কুমিল্লার মাটি তাঁকে আপন করে নিয়েছিল, সেই শহরের মানুষ আজও তাঁর নাম শ্রদ্ধায় উচ্চারণ করে। কিন্তু সেই সঙ্গে হয়তো আরও কিছু দৃশ্য তাঁকে কষ্ট দিত। যখন ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়, যখন সত্য বলার সাহস কমে যায়, যখন মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে ক্ষমতা ধরে রাখাই বড় হয়ে ওঠে, তখন কি আমরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্বপ্নের বাংলাদেশ থেকে দূরে সরে যাই না?
আমার কাছে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত শুধু ইতিহাসের একজন নেতা নন। তিনি আমাদের কুমিল্লার এমন এক অভিভাবক, যিনি নিজের জীবন দিয়ে শিখিয়ে গেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে বয়স লাগে না, ক্ষমতা লাগে না, প্রয়োজন শুধু একটি সৎ বিবেক। কুমিল্লার মানুষ হিসেবে আমাদের গর্বের অনেক কিছু আছে। আমাদের ইতিহাস আছে, সাহিত্য আছে, সংস্কৃতি আছে, অসংখ্য কীর্তিমান মানুষের স্মৃতি আছে। কিন্তু যখন ভাবি, এই শহরেরই এক প্রবীণ মানুষ পাকিস্তানের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে কোটি বাঙালির ভাষার মর্যাদার দাবি তুলেছিলেন, তখন কুমিল্লার সন্তান হিসেবে বুকটা অন্যরকম গর্বে ভরে ওঠে। আবার যখন ভাবি, সেই মানুষটিকেই একদিন এই শহর থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল, তখন সেই গর্বের সঙ্গে মিশে যায় এক অসহনীয় বেদনা।
আমরা তাঁর জন্য একটি কবরও পাইনি, যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারব, ধীরেনবাবু, আমরা আপনাকে ভুলিনি।
তাঁর স্মরণে সড়ক আছে, স্থাপনা আছে, সম্মাননা আছে। কিন্তু তাঁর আদর্শ আমাদের সমাজে কতটা বেঁচে আছে, সেটাই আজ বড় প্রশ্ন। আমরা কি আমাদের সন্তানদের ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের গল্প শোনাই? আমরা কি তাদের বলি, বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এই মানুষটির কী অসামান্য অবদান? আমরা কি শেখাই, দেশকে ভালোবাসার অর্থ শুধু তার ভালো দিকগুলো নিয়ে গর্ব করা নয়, বরং দেশের অন্যায়, অবিচার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো? যদি না শেখাই, তাহলে শুধু একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিয়ে আর স্বাধীনতা দিবসে পতাকা উড়িয়ে আমরা ইতিহাসের ঋণ শোধ করতে পারব না।
আজ ধর্মসাগরের পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখনো যদি মনে হয়, এই পথ দিয়েই একদিন হেঁটে যেতেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, একটু থামবেন। কল্পনা করবেন, এক বৃদ্ধ মানুষ ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। হয়তো কোনো অসহায় মানুষ তাঁর কাছে এসে সাহায্য চাইছেন। তিনি থামছেন, কথা শুনছেন, আশ্বাস দিচ্ছেন। তারপর মনে করবেন সেই অন্য দৃশ্যটি। ময়নামতীর সেনানিবাসে সেই মানুষটিই একদিন অসহায়ভাবে হামাগুড়ি দিচ্ছেন। যে মানুষটি একটি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের শরীরটুকুকে দাঁড়ানোর শক্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এরপরও যদি বুকের ভেতরটা হু হু করে না ওঠে, তাহলে আমাদের নিজেদের বিবেককে একবার প্রশ্ন করা উচিত। আমরা কি সত্যিই আমাদের ইতিহাসকে অনুভব করি, নাকি শুধু মুখস্থ করি?
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর। তাঁর জন্মদিন আসে, চলে যায়। আমরা অনেকেই হয়তো খেয়ালও করি না। অথচ কত জন্মদিন, কত মৃত্যুদিন, কত রাজনৈতিক আয়োজন নিয়ে আমাদের ব্যস্ততা! যে মানুষটির সাহসী উচ্চারণ আমাদের ভাষার সংগ্রামের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছে, তাঁর জন্য আমাদের সময় এত কম কেন? আজ আমার কুমিল্লার কাছে, আমার বাংলাদেশের কাছে একটাই আবেদন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে শুধু ইতিহাসের একটি নাম কিংবা পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি লাইনের মধ্যে আটকে রাখবেন না। তাঁকে আমাদের সন্তানের কাছে পৌঁছে দিন। তাঁর জীবন, সাহস, আত্মত্যাগ আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার গল্প শোনান। কারণ যে জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মত্যাগের কথা ভুলে যায়, একদিন সেই জাতি নিজের আত্মপরিচয়ও হারিয়ে ফেলার ঝুঁকিতে পড়ে।
আর সবশেষে ধীরেনবাবুকে একটি কথা বলতে ইচ্ছে করে।
ধীরেনবাবু, আপনি যে বাংলার জন্য কথা বলেছিলেন, সেই বাংলা আজ স্বাধীন। আপনি যে ভাষার মর্যাদা চেয়েছিলেন, সেই ভাষায় আজ আমরা কথা বলি, গান গাই, কবিতা লিখি, ভালোবাসি। আপনি যে পতাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই পতাকা আজ আমাদের আকাশে ওড়ে। কিন্তু আপনি যে মানবিক, মর্যাদাপূর্ণ, বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন আমরা কতটুকু পূরণ করতে পেরেছি, তার উত্তর দিতে আজও আমাদের সংকোচ হয়। ক্ষমা চাইব না, কারণ শুধু ক্ষমা চেয়ে ইতিহাসের ঋণ শোধ হয় না। বরং প্রতিজ্ঞা করতে চাই, এই বাংলাদেশে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যেন আর কাউকে এমন নির্মম পরিণতি বরণ করতে না হয়। সত্য বলার জন্য যেন আর কোনো মানুষকে জীবন দিতে না হয়। আর কোনো ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে যেন নিজের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে এমন করুণ পরিণতি বরণ করতে না হয়।
**ধীরেনবাবু, আপনার কবরের ঠিকানা আমরা জানি না। কিন্তু এই বাংলার প্রতিটি উচ্চারিত শব্দে আপনার সংগ্রামের ইতিহাস বেঁচে আছে।**
আপনি ফিরে আসেননি। কিন্তু আপনার ভাষা ফিরে পেয়েছে তার অধিকার। আপনার শরীরকে মাটিতে নামিয়ে আনা হয়েছিল, কিন্তু আপনার বিশ্বাসকে কেউ মাথা নত করাতে পারেনি।
আর তাই কুমিল্লার ধর্মসাগরের জল যখন বাতাসে কেঁপে ওঠে, আমার মনে হয়, ইতিহাসের গভীর থেকে আজও কেউ যেন আমাদের জিজ্ঞেস করেন,
যে বাংলার জন্য আমি জীবন দিলাম, সেই বাংলায় তোমরা সবাই ভালো আছ তো?”
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস কি আমাদের আছে?
ভাস্কর মজুমদার: আড়ংয়ের মহাব্যবস্থাপক।