ভাস্কর মজুমদার

জন্মাষ্টমী এলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাঁশি হাতে নীলবর্ণের শ্রীকৃষ্ণ, বৃন্দাবনের লীলা, রাধাকৃষ্ণের প্রেম কিংবা কুরুক্ষেত্রে অর্জুনকে দেওয়া গীতার অমর বাণী। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের জীবনের আরেকটি দিক অনেক সময় আমাদের আলোচনার আড়ালেই থেকে যায়। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক, দূরদর্শী কূটনীতিক, দক্ষ সংগঠক এবং সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত বিচক্ষণ একজন প্রশাসক।
মহাভারত ও পুরাণের বর্ণনায় শ্রীকৃষ্ণকে দেখলে বোঝা যায়, তিনি শুধু ধর্মের কথা বলেননি, বাস্তব জগতের রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা, নিরাপত্তা, কূটনীতি ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও অসাধারণ প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।
মথুরায় কংসের অত্যাচারের অবসান ঘটানোর পর কৃষ্ণ নিজে সিংহাসন দখল করেননি। বরং উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা অর্জনই নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য নয়। প্রকৃত নেতৃত্বের লক্ষ্য হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা।
পরবর্তী সময়ে মথুরা বারবার আক্রমণের মুখে পড়লে তিনি শুধু বীরত্ব দেখিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নেননি। জনগণের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাদব জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে দ্বারকা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে লড়াই করাকেই সাহস মনে করেন, কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক জানেন কখন যুদ্ধ করতে হয়, আবার কখন জনগণ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে কৌশল পরিবর্তন করতে হয়। কৃষ্ণের দ্বারকা প্রতিষ্ঠা সেই দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার একটি বড় উদাহরণ।
কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত ছিল মানুষকে বোঝার ক্ষমতা। কার সামর্থ্য কোথায়, কাকে কোন দায়িত্ব দিলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে, তিনি তা অসাধারণভাবে উপলব্ধি করতেন। মহাভারতের পুরো ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, তিনি প্রায় কখনোই নিজের শক্তিকে সামনে রেখে নেতৃত্ব দেননি। বরং সঠিক মানুষকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে তাঁর কূটনৈতিক ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ অনিবার্য হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি শান্তির পথ খোলা রেখেছিলেন। পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে শান্তিদূত হয়ে হস্তিনাপুরে গিয়ে তিনি সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। পাণ্ডবদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিনি এমন সমাধান খুঁজেছিলেন, যাতে ভয়াবহ যুদ্ধ এড়ানো যায়। অর্থাৎ তাঁর কাছে যুদ্ধ ছিল প্রথম সমাধান নয়, শেষ বিকল্প।
এখানেই কৃষ্ণের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা আজও প্রাসঙ্গিক। একজন দক্ষ কূটনীতিক জানেন, আলোচনার সময় কখন নমনীয় হতে হয়, কখন দৃঢ় থাকতে হয় এবং কোন সীমার পরে আপস করলে ন্যায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষ্ণ শান্তির জন্য চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও তিনি অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি। তিনি হয়েছিলেন অর্জুনের সারথি। বাহ্যিকভাবে একজন সারথির অবস্থান হয়তো রাজা বা সেনাপতির নিচে, কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নির্দেশনা এসেছে তাঁর কাছ থেকেই। এখানে কৃষ্ণ আমাদের নেতৃত্বের একটি অসাধারণ শিক্ষা দিয়ে গেছেন: নেতৃত্ব মানে সব সময় সামনে দাঁড়িয়ে কৃতিত্ব নেওয়া নয়; কখনো কখনো পেছনে থেকে অন্যকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করাই সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব।
শ্রীকৃষ্ণ একজন শক্তিশালী জোট নির্মাতাও ছিলেন। মহাভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন রাজ্য, রাজা ও শক্তির মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত জটিল। তিনি সেই সম্পর্কগুলো বুঝতেন, প্রয়োজনীয় মিত্র তৈরি করতেন এবং বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা কৌশলগত জোট, ক্ষমতার ভারসাম্য কিংবা রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক বলি, তার বহু দৃষ্টান্ত কৃষ্ণের কর্মকাণ্ডে দেখা যায়।
তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘ধর্ম’। এখানে ধর্ম শুধু উপাসনার বিষয় নয়; ধর্ম অর্থ ন্যায়, দায়িত্ব, কর্তব্য এবং সমাজে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। তাই গীতায় তিনি অর্জুনকে শুধু যুদ্ধ করতে বলেননি, নিজের দায়িত্ব বুঝতে বলেছেন। ব্যক্তিগত আবেগ, সম্পর্ক কিংবা ভয় যেন বৃহত্তর দায়িত্ব পালনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেই শিক্ষাই তিনি দিয়েছেন।
আজকের প্রশাসন ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। একজন দক্ষ প্রশাসকের সিদ্ধান্ত সব সময় জনপ্রিয় নাও হতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি যদি বৃহত্তর স্বার্থে, ন্যায়বোধ থেকে এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা বিবেচনা করে নেওয়া হয়, তবে সেটিই প্রকৃত নেতৃত্ব।
শ্রীকৃষ্ণের জীবনে তাই আমরা এক অদ্ভুত সমন্বয় দেখি। তিনি প্রেমের প্রতীক, আবার প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। তিনি শান্তির দূত, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথপ্রদর্শক। তিনি রাজপরিবারের মানুষ, কিন্তু ক্ষমতার মোহে আবদ্ধ নন। তিনি যোদ্ধাদের মধ্যে থেকেও সব সময় অস্ত্রের চেয়ে বুদ্ধি ও কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
সম্ভবত এ কারণেই হাজার বছর পরও শ্রীকৃষ্ণ শুধু মন্দিরের দেবতা হয়ে থাকেননি। তিনি দর্শনে আছেন, সাহিত্যে আছেন, রাষ্ট্রচিন্তায় আছেন, নেতৃত্বের শিক্ষায় আছেন, মানুষের সংকটের মুহূর্তেও আছেন।
জন্মাষ্টমীর এই পবিত্র দিনে তাই শ্রীকৃষ্ণকে শুধু বাঁশি হাতে বৃন্দাবনের কৃষ্ণ হিসেবে দেখলে তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের একটি অংশই দেখা হয়। তাঁকে দেখতে হবে দ্বারকার রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, শান্তিদূত কৃষ্ণ হিসেবে, কুরুক্ষেত্রের কৌশলী পথপ্রদর্শক হিসেবে এবং এমন একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে, যিনি বুঝেছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু শক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং সর্বোপরি ন্যায়ের প্রতি অবিচল অবস্থান।
আজকের পৃথিবীতে নেতৃত্বের সংকট যখন প্রায় সর্বত্র দৃশ্যমান, তখন শ্রীকৃষ্ণের জীবন আমাদের একটি সহজ কিন্তু গভীর কথা মনে করিয়ে দেয়: ক্ষমতার আসনে বসাই বড় কথা নয়, সেই ক্ষমতাকে ন্যায়, মানুষের কল্যাণ ও বৃহত্তর দায়িত্বের জন্য ব্যবহার করাই একজন সত্যিকারের নেতার পরিচয়।
শুভ জন্মাষ্টমী।
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

জন্মাষ্টমী এলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাঁশি হাতে নীলবর্ণের শ্রীকৃষ্ণ, বৃন্দাবনের লীলা, রাধাকৃষ্ণের প্রেম কিংবা কুরুক্ষেত্রে অর্জুনকে দেওয়া গীতার অমর বাণী। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের জীবনের আরেকটি দিক অনেক সময় আমাদের আলোচনার আড়ালেই থেকে যায়। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক, দূরদর্শী কূটনীতিক, দক্ষ সংগঠক এবং সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত বিচক্ষণ একজন প্রশাসক।
মহাভারত ও পুরাণের বর্ণনায় শ্রীকৃষ্ণকে দেখলে বোঝা যায়, তিনি শুধু ধর্মের কথা বলেননি, বাস্তব জগতের রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা, নিরাপত্তা, কূটনীতি ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও অসাধারণ প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।
মথুরায় কংসের অত্যাচারের অবসান ঘটানোর পর কৃষ্ণ নিজে সিংহাসন দখল করেননি। বরং উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা অর্জনই নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য নয়। প্রকৃত নেতৃত্বের লক্ষ্য হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা।
পরবর্তী সময়ে মথুরা বারবার আক্রমণের মুখে পড়লে তিনি শুধু বীরত্ব দেখিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নেননি। জনগণের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাদব জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে দ্বারকা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে লড়াই করাকেই সাহস মনে করেন, কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক জানেন কখন যুদ্ধ করতে হয়, আবার কখন জনগণ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে কৌশল পরিবর্তন করতে হয়। কৃষ্ণের দ্বারকা প্রতিষ্ঠা সেই দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার একটি বড় উদাহরণ।
কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত ছিল মানুষকে বোঝার ক্ষমতা। কার সামর্থ্য কোথায়, কাকে কোন দায়িত্ব দিলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে, তিনি তা অসাধারণভাবে উপলব্ধি করতেন। মহাভারতের পুরো ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, তিনি প্রায় কখনোই নিজের শক্তিকে সামনে রেখে নেতৃত্ব দেননি। বরং সঠিক মানুষকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে তাঁর কূটনৈতিক ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ অনিবার্য হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি শান্তির পথ খোলা রেখেছিলেন। পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে শান্তিদূত হয়ে হস্তিনাপুরে গিয়ে তিনি সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। পাণ্ডবদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিনি এমন সমাধান খুঁজেছিলেন, যাতে ভয়াবহ যুদ্ধ এড়ানো যায়। অর্থাৎ তাঁর কাছে যুদ্ধ ছিল প্রথম সমাধান নয়, শেষ বিকল্প।
এখানেই কৃষ্ণের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা আজও প্রাসঙ্গিক। একজন দক্ষ কূটনীতিক জানেন, আলোচনার সময় কখন নমনীয় হতে হয়, কখন দৃঢ় থাকতে হয় এবং কোন সীমার পরে আপস করলে ন্যায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষ্ণ শান্তির জন্য চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও তিনি অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি। তিনি হয়েছিলেন অর্জুনের সারথি। বাহ্যিকভাবে একজন সারথির অবস্থান হয়তো রাজা বা সেনাপতির নিচে, কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নির্দেশনা এসেছে তাঁর কাছ থেকেই। এখানে কৃষ্ণ আমাদের নেতৃত্বের একটি অসাধারণ শিক্ষা দিয়ে গেছেন: নেতৃত্ব মানে সব সময় সামনে দাঁড়িয়ে কৃতিত্ব নেওয়া নয়; কখনো কখনো পেছনে থেকে অন্যকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করাই সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব।
শ্রীকৃষ্ণ একজন শক্তিশালী জোট নির্মাতাও ছিলেন। মহাভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন রাজ্য, রাজা ও শক্তির মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত জটিল। তিনি সেই সম্পর্কগুলো বুঝতেন, প্রয়োজনীয় মিত্র তৈরি করতেন এবং বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা কৌশলগত জোট, ক্ষমতার ভারসাম্য কিংবা রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক বলি, তার বহু দৃষ্টান্ত কৃষ্ণের কর্মকাণ্ডে দেখা যায়।
তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘ধর্ম’। এখানে ধর্ম শুধু উপাসনার বিষয় নয়; ধর্ম অর্থ ন্যায়, দায়িত্ব, কর্তব্য এবং সমাজে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। তাই গীতায় তিনি অর্জুনকে শুধু যুদ্ধ করতে বলেননি, নিজের দায়িত্ব বুঝতে বলেছেন। ব্যক্তিগত আবেগ, সম্পর্ক কিংবা ভয় যেন বৃহত্তর দায়িত্ব পালনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেই শিক্ষাই তিনি দিয়েছেন।
আজকের প্রশাসন ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। একজন দক্ষ প্রশাসকের সিদ্ধান্ত সব সময় জনপ্রিয় নাও হতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি যদি বৃহত্তর স্বার্থে, ন্যায়বোধ থেকে এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা বিবেচনা করে নেওয়া হয়, তবে সেটিই প্রকৃত নেতৃত্ব।
শ্রীকৃষ্ণের জীবনে তাই আমরা এক অদ্ভুত সমন্বয় দেখি। তিনি প্রেমের প্রতীক, আবার প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। তিনি শান্তির দূত, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথপ্রদর্শক। তিনি রাজপরিবারের মানুষ, কিন্তু ক্ষমতার মোহে আবদ্ধ নন। তিনি যোদ্ধাদের মধ্যে থেকেও সব সময় অস্ত্রের চেয়ে বুদ্ধি ও কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
সম্ভবত এ কারণেই হাজার বছর পরও শ্রীকৃষ্ণ শুধু মন্দিরের দেবতা হয়ে থাকেননি। তিনি দর্শনে আছেন, সাহিত্যে আছেন, রাষ্ট্রচিন্তায় আছেন, নেতৃত্বের শিক্ষায় আছেন, মানুষের সংকটের মুহূর্তেও আছেন।
জন্মাষ্টমীর এই পবিত্র দিনে তাই শ্রীকৃষ্ণকে শুধু বাঁশি হাতে বৃন্দাবনের কৃষ্ণ হিসেবে দেখলে তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের একটি অংশই দেখা হয়। তাঁকে দেখতে হবে দ্বারকার রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, শান্তিদূত কৃষ্ণ হিসেবে, কুরুক্ষেত্রের কৌশলী পথপ্রদর্শক হিসেবে এবং এমন একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে, যিনি বুঝেছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু শক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং সর্বোপরি ন্যায়ের প্রতি অবিচল অবস্থান।
আজকের পৃথিবীতে নেতৃত্বের সংকট যখন প্রায় সর্বত্র দৃশ্যমান, তখন শ্রীকৃষ্ণের জীবন আমাদের একটি সহজ কিন্তু গভীর কথা মনে করিয়ে দেয়: ক্ষমতার আসনে বসাই বড় কথা নয়, সেই ক্ষমতাকে ন্যায়, মানুষের কল্যাণ ও বৃহত্তর দায়িত্বের জন্য ব্যবহার করাই একজন সত্যিকারের নেতার পরিচয়।
শুভ জন্মাষ্টমী।
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।