ভাস্কর মজুমদার

একজন মা সারারাত তাঁর সন্তানকে খুঁজেছেন। কখনো পরিচিত মানুষের কাছে ফোন করেছেন, কখনো প্রশাসনের কাছে ছুটেছেন, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই হাত জোড় করে লিখেছেন, “আমার ছেলেকে বাঁচান।” হয়তো সেই রাতের প্রতিটি শব্দে তিনি সন্তানের পায়ের আওয়াজ শুনেছেন। হয়তো বারবার দরজার দিকে তাকিয়েছেন, এই বুঝি অপ্রতিম ফিরে এলো। একজন মায়ের মন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করতে চায়, তাঁর সন্তান ফিরে আসবেই।
কিন্তু অপ্রতিম আর ফিরে আসেনি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক নাহিদা নাহিদের ১৩ বছরের সন্তান অপ্রতিম। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে বাসা থেকে বেরিয়েছিল। সঙ্গে ছিল মায়ের ফোন। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা ছিল। যে ছেলেটি ছবি তুলতে বেরিয়েছিল, পরদিন তারই নিথর দেহ পাওয়া গেল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায়।
একবার ভাবুন, একজন মায়ের কাছে এই কয়েকটি ঘণ্টা কত দীর্ঘ ছিল! আগের দিন যে হাতে সন্তানকে খাবার দিয়েছেন, যে ছেলেকে হয়তো পড়াশোনা করতে বলেছেন, একটু বকেছেন, একটু আদর করেছেন, সেই সন্তানকে পরদিন তাঁকে চিনতে হচ্ছে একটি নিথর দেহ হিসেবে। পৃথিবীতে এর চেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য একজন মায়ের জন্য আর কী হতে পারে?

আমরা প্রতিনিয়ত একটি নতুন বাংলাদেশের কথা বলি। পরিবর্তনের কথা বলি। ন্যায়বিচারের কথা বলি। নিরাপদ সমাজের স্বপ্ন দেখি। রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে, সরকার বদলায়, ¯েøাগান বদলায়, দেয়ালের লেখা বদলায়, মানুষের প্রত্যাশাও বদলায়। কিন্তু একটি প্রশ্ন কি বদলায়? আমার সন্তান ঘর থেকে বের হলে সে কি নিরাপদে আমার কাছে ফিরে আসবে?
এই প্রশ্নটির কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। এখানে আওয়ামী লীগ নেই, বিএনপি নেই, জামায়াত নেই, কোনো পক্ষ নেই। এখানে শুধু একজন মা আছেন এবং তাঁর সন্তান আছে। এখানে বাংলাদেশের প্রতিটি বাবা-মা আছেন। কারণ আজ অপ্রতিমের মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সন্তানকে খুঁজেছেন, কাল একই জায়গায় আমাদের যে কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাইনি, যেখানে সন্তানের সন্ধান চেয়ে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাত জোড় করতে হবে। আমরা এমন সমাজও চাই না, যেখানে একটি শিশু বিকেলে ঘর থেকে বের হবে আর পরদিন তার নিথর শরীর পড়ে থাকবে কোনো নির্জন স্থানে। আমরা চাই, একটি মা রাত দশটা বাজলেও বিশ্বাস করতে পারবেন, তাঁর সন্তান নিরাপদে ফিরে আসবে। একটি শিশু ভয় ছাড়া রাস্তায় হাঁটবে। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে যাওয়াটা তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে না।
অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ কী, তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, কারও অপরাধ আছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসতে হবে। অনুমান কিংবা আবেগ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কিন্তু একটি দাবি আজই করা যায়: সত্যটা জানতে হবে। দ্রæত জানতে হবে। কোনো অপরাধ ঘটে থাকলে দায়ীদের আইনের সামনে আনতে হবে। কারণ বিচার শুধু একজন মৃত শিশুর জন্য নয়, বিচার জীবিত শিশুদের নিরাপত্তার জন্যও প্রয়োজন।
আজ হয়তো নাহিদা নাহিদের ঘরে অপ্রতিমের বইগুলো পড়ে আছে। তার পোশাক আছে। স্কুলব্যাগ আছে। বিছানা আছে। হয়তো ফোনের গ্যালারিতে তার অসংখ্য হাসিমুখের ছবি আছে। শুধু ছবির মানুষটি নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় অনুভ‚তি সম্ভবত এটাই, সন্তানের সবকিছু আছে, শুধু সন্তানটি নেই।
কয়েক দিন পর হয়তো নতুন কোনো ঘটনা আসবে। আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইন বদলে যাবে। টেলিভিশনের শিরোনাম বদলে যাবে। আমরা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাব। কিন্তু একজন মায়ের কাছে ১৯ সেপ্টেম্বরের দিনটি কোনো দিন শেষ হবে না। তাঁর জীবনের ক্যালেন্ডার হয়তো সেদিনই দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, অপ্রতিম থাকার সময় এবং অপ্রতিম না থাকার সময়।
তাই এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক হয়ে না থাকুক। এটি আমাদের বিবেকের সামনে একটি প্রশ্ন হয়ে থাকুক।
নতুন বাংলাদেশ মানে শুধু নতুন স্লোগান নয়। নতুন বাংলাদেশ মানে এমন একটি দেশ, যেখানে একজন মা তাঁর সন্তানকে বাইরে পাঠিয়ে সারাক্ষণ মৃত্যুভয়ে থাকবেন না। যেখানে একটি শিশুর জীবনের মূল্য রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বড় হবে। যেখানে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সাধারণ অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হবে, তোমার সন্তানকে নিরাপদ রাখার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
আজ অপ্রতিম আর কোনো উত্তর চাইবে না।
তার হয়ে উত্তর চাইছেন একজন মা।
আর সেই মায়ের নীরব প্রশ্নটি আজ আমাদের সবার কাছে:
আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেখানে একটি ১৩ বছরের শিশুর নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকারটুকুও কি নিশ্চিত করতে পারলাম?
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

একজন মা সারারাত তাঁর সন্তানকে খুঁজেছেন। কখনো পরিচিত মানুষের কাছে ফোন করেছেন, কখনো প্রশাসনের কাছে ছুটেছেন, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই হাত জোড় করে লিখেছেন, “আমার ছেলেকে বাঁচান।” হয়তো সেই রাতের প্রতিটি শব্দে তিনি সন্তানের পায়ের আওয়াজ শুনেছেন। হয়তো বারবার দরজার দিকে তাকিয়েছেন, এই বুঝি অপ্রতিম ফিরে এলো। একজন মায়ের মন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করতে চায়, তাঁর সন্তান ফিরে আসবেই।
কিন্তু অপ্রতিম আর ফিরে আসেনি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক নাহিদা নাহিদের ১৩ বছরের সন্তান অপ্রতিম। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে বাসা থেকে বেরিয়েছিল। সঙ্গে ছিল মায়ের ফোন। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা ছিল। যে ছেলেটি ছবি তুলতে বেরিয়েছিল, পরদিন তারই নিথর দেহ পাওয়া গেল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায়।
একবার ভাবুন, একজন মায়ের কাছে এই কয়েকটি ঘণ্টা কত দীর্ঘ ছিল! আগের দিন যে হাতে সন্তানকে খাবার দিয়েছেন, যে ছেলেকে হয়তো পড়াশোনা করতে বলেছেন, একটু বকেছেন, একটু আদর করেছেন, সেই সন্তানকে পরদিন তাঁকে চিনতে হচ্ছে একটি নিথর দেহ হিসেবে। পৃথিবীতে এর চেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য একজন মায়ের জন্য আর কী হতে পারে?

আমরা প্রতিনিয়ত একটি নতুন বাংলাদেশের কথা বলি। পরিবর্তনের কথা বলি। ন্যায়বিচারের কথা বলি। নিরাপদ সমাজের স্বপ্ন দেখি। রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে, সরকার বদলায়, ¯েøাগান বদলায়, দেয়ালের লেখা বদলায়, মানুষের প্রত্যাশাও বদলায়। কিন্তু একটি প্রশ্ন কি বদলায়? আমার সন্তান ঘর থেকে বের হলে সে কি নিরাপদে আমার কাছে ফিরে আসবে?
এই প্রশ্নটির কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। এখানে আওয়ামী লীগ নেই, বিএনপি নেই, জামায়াত নেই, কোনো পক্ষ নেই। এখানে শুধু একজন মা আছেন এবং তাঁর সন্তান আছে। এখানে বাংলাদেশের প্রতিটি বাবা-মা আছেন। কারণ আজ অপ্রতিমের মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সন্তানকে খুঁজেছেন, কাল একই জায়গায় আমাদের যে কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাইনি, যেখানে সন্তানের সন্ধান চেয়ে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাত জোড় করতে হবে। আমরা এমন সমাজও চাই না, যেখানে একটি শিশু বিকেলে ঘর থেকে বের হবে আর পরদিন তার নিথর শরীর পড়ে থাকবে কোনো নির্জন স্থানে। আমরা চাই, একটি মা রাত দশটা বাজলেও বিশ্বাস করতে পারবেন, তাঁর সন্তান নিরাপদে ফিরে আসবে। একটি শিশু ভয় ছাড়া রাস্তায় হাঁটবে। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে যাওয়াটা তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে না।
অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ কী, তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, কারও অপরাধ আছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসতে হবে। অনুমান কিংবা আবেগ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কিন্তু একটি দাবি আজই করা যায়: সত্যটা জানতে হবে। দ্রæত জানতে হবে। কোনো অপরাধ ঘটে থাকলে দায়ীদের আইনের সামনে আনতে হবে। কারণ বিচার শুধু একজন মৃত শিশুর জন্য নয়, বিচার জীবিত শিশুদের নিরাপত্তার জন্যও প্রয়োজন।
আজ হয়তো নাহিদা নাহিদের ঘরে অপ্রতিমের বইগুলো পড়ে আছে। তার পোশাক আছে। স্কুলব্যাগ আছে। বিছানা আছে। হয়তো ফোনের গ্যালারিতে তার অসংখ্য হাসিমুখের ছবি আছে। শুধু ছবির মানুষটি নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় অনুভ‚তি সম্ভবত এটাই, সন্তানের সবকিছু আছে, শুধু সন্তানটি নেই।
কয়েক দিন পর হয়তো নতুন কোনো ঘটনা আসবে। আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইন বদলে যাবে। টেলিভিশনের শিরোনাম বদলে যাবে। আমরা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাব। কিন্তু একজন মায়ের কাছে ১৯ সেপ্টেম্বরের দিনটি কোনো দিন শেষ হবে না। তাঁর জীবনের ক্যালেন্ডার হয়তো সেদিনই দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, অপ্রতিম থাকার সময় এবং অপ্রতিম না থাকার সময়।
তাই এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক হয়ে না থাকুক। এটি আমাদের বিবেকের সামনে একটি প্রশ্ন হয়ে থাকুক।
নতুন বাংলাদেশ মানে শুধু নতুন স্লোগান নয়। নতুন বাংলাদেশ মানে এমন একটি দেশ, যেখানে একজন মা তাঁর সন্তানকে বাইরে পাঠিয়ে সারাক্ষণ মৃত্যুভয়ে থাকবেন না। যেখানে একটি শিশুর জীবনের মূল্য রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বড় হবে। যেখানে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সাধারণ অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হবে, তোমার সন্তানকে নিরাপদ রাখার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
আজ অপ্রতিম আর কোনো উত্তর চাইবে না।
তার হয়ে উত্তর চাইছেন একজন মা।
আর সেই মায়ের নীরব প্রশ্নটি আজ আমাদের সবার কাছে:
আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেখানে একটি ১৩ বছরের শিশুর নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকারটুকুও কি নিশ্চিত করতে পারলাম?
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।