অমৃত লাল দত্ত

বীর মুক্তিযোদ্ধা মুনিরুল চৌধুরী- কুমিল্লা-৬ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। কিছু সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সূত্রে তাঁকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ ইতিহাসের কথা আগে অনেকের মুখে শুনেছি, কিন্তু এতদিন তাঁর সম্মুখে বসে তাঁর কথা শোনার সুযোগ হয়নি।
মানুষকে দূর থেকে দেখা আর কাছে থেকে দেখা—এই দুইয়ের মধ্যে যে কতখানি তফাৎ, তা হয়তো জীবনের এই ষাটের কোঠায় এসে আরও ভালো করে বুঝতে শিখেছি।
ছাত্রজীবনে সামান্য বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কোনো উল্লেখযোগ্য পদ-পদবির অলংকার আমার ভাগ্যে জোটেনি; কিন্তু সেই বয়সে রাজনীতির কিছু বই পড়েছিলাম, পৃথিবীর নানা দেশের নেতাদের জীবন ও সংগ্রামের কথা জানার চেষ্টা করেছিলাম। নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে মহাত্মা গান্ধী-মানুষের মুক্তি, রাষ্ট্রের চরিত্র এবং রাজনীতির নৈতিকতা নিয়ে যাঁরা তাঁদের জীবনকে প্রশ্নের মধ্যে নিক্ষেপ করেছিলেন, তাঁদের প্রতি এক ধরনের কৌতূহল ও শ্রদ্ধা জন্মেছিল।
গান্ধীর A Passage to India পড়ার সময়ও মনে হয়েছিল-দেশকে বুঝতে হলে শুধু তার মানচিত্র দেখলেই হয় না; তার মানুষের মুখ, দুঃখ, স্বপ্ন এবং ইতিহাসের ভাঁজগুলোও পড়তে হয়।
আমি কোনোদিন বড় রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম না। একজন নাগরিক হিসাবে দেশের রাজনীতিকে অনেকটা দূর থেকে দেখেছি, কখনো কখনো তার উত্তাল স্রোতে পা ভিজিয়েছি। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের বহু মিছিলে ছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার দরজায় যাওয়ার সিঁড়ি নয়—কখনো কখনো তা মানুষের বিবেকেরও মিছিল।
সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতন, গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রয়কার অভিঘাত আমাদের দেশের রাজনীতিতেও এসে পৌঁছেছিল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজন দেখেছি। কমরেড সাইফুদ্দিন মানিক ভাই গণফোরামে গেলেন, কমরেড নুরুল ইসলাম নাহিদ্ সহ আরেক অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হলো।
আমার সে সময়কার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলও পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন।
রাজনীতির পথ যে কত বিচিত্র, তার সাক্ষী সময় নিজেই।
কমরেড মণি সিংহের মৃত্যুর কথাও আজ মনে পড়ে। পল্টনের পার্টি অফিসের সামনে তাঁর মরদেহ রাখা হয়েছিল। ডাকসুর নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের বহু নেতা এসে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। সারাদিন আমরা সেখানে ছিলাম। পরে পোস্তগোলার শ্যামপুর মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য পর্যন্ত অন্যদের সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম।
তারপর আর কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা হয়নি। জীবন আমাকে রাজনীতির মঞ্চ থেকে সরিয়ে দিয়েছে; কিন্তু রাজনীতিকে দেখার চোখটি হয়তো পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারেনি।
এই দীর্ঘ সময়ের পর, হঠাৎ মুনিরুল চৌধুরী এমপিকে খুব কাছ থেকে দেখলাম।
আমি সবার পেছনে বসে তাঁর কথা শুনি। কোনো বিশেষ পরিচয়ের দাবি নিয়ে নয়—একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, একজন নীরব শ্রোতা হিসেবে।
কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, তাঁর কথার প্রতিটি শব্দ যেন আমার পুরোনো কোনো পড়া বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে বর্তমানের সঙ্গে কথা বলছে। তাঁর বক্তব্যে শুধু রাজনীতির ভাষা নেই; কোথাও যেন বিজ্ঞান, কোথাও দর্শন, কোথাও রাষ্ট্রচিন্তা, আবার কোথাও মানুষের প্রতি এক গভীর দায়বোধের স্পর্শ আছে।
আমার মনে হলো—রাজনীতি যদি সত্যিই মানুষের এবং রাষ্ট্রের কল্যাণের বিজ্ঞান হয়ে থাকে, তবে তার অন্তরে দর্শনেরও একটি নীরব আসন থাকা প্রয়োজন।
কারণ ক্ষমতা রাষ্ট্র চালাতে পারে, কিন্তু দর্শন মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়; আর প্রশ্নহীন রাজনীতি একদিন কেবল ক্ষমতার কৌশলে পরিণত হয়।
আজকের এই নষ্ট ও ক্লান্ত রাজনীতির আকাল-বাজারে দাঁড়িয়ে তাই এমন একজন মানুষকে কাছে থেকে দেখে আমার ভালো লাগে—যিনি রাজনীতিকে কেবল দল, পদ কিংবা নির্বাচনের অঙ্কে সীমাবদ্ধ না রেখে তার গভীরে মানুষ, রাষ্ট্র, ইতিহাস ও চিন্তার সম্পর্ককে স্পর্শ করতে চান।
আমি জানি না, আমার এই সামান্য লেখা কোনোদিন তাঁর চোখে পড়বে কি না। হয়তো পড়বে না। পড়ার প্রয়োজনও নেই।
আমি রাজনীতি করি না, করার ইচ্ছাও নেই। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দেওয়ার জন্যও এ লেখা নয়। এটি কেবল একজন ষাটের কোঠায় পৌঁছানো সাধারণ নাগরিকের নিজের দেখা, নিজের শোনা এবং নিজের ভিতরে জেগে ওঠা একটি অনুভূতির কথা মাত্র।
জীবনের পথে অনেক নেতা দেখেছি; অনেক বক্তৃতা শুনেছি; অনেক বড় নেতার বক্তৃতা আমার হুবহু মুখস্থ আছে ।
অনেক পতাকা উঠতে ও নামতে দেখেছি। কিন্তু খুব অল্প কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কথা শুনে মনে হয়—রাজনীতি এখনও সম্পূর্ণরূপে তার আত্মা হারিয়ে ফেলেনি।
মুনিরুল চৌধুরীকে দেখে আমার সেই বিশ্বাসটুকুই আবার জেগে উঠেছে।
রাষ্ট্রের চেয়ে মানুষ বড় নয়—কিন্তু মানুষের কল্যাণ ছাড়া রাষ্ট্রও অর্থহীন।
ক্ষমতার চেয়ে বড় পদ নয়—কিন্তু নীতিহীন ক্ষমতা মানুষ তথা রাষ্ট্রের জন্য অন্ধকার।
রাজনীতির শেষ কথা যদি মানুষই হয়, তবে সেই রাজনীতির প্রতি আমার আজও সামান্য শ্রদ্ধা আছে উনাকে দেখার পর।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মুনিরুল চৌধুরীর (এমপি) সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘ জীবন এবং চিন্তার এই আলোকিত পথ আরও দীর্ঘ হোক—এই আমার একান্ত ব্যক্তিগত কামনা।
এইটুকুই।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মুনিরুল চৌধুরী- কুমিল্লা-৬ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। কিছু সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সূত্রে তাঁকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ ইতিহাসের কথা আগে অনেকের মুখে শুনেছি, কিন্তু এতদিন তাঁর সম্মুখে বসে তাঁর কথা শোনার সুযোগ হয়নি।
মানুষকে দূর থেকে দেখা আর কাছে থেকে দেখা—এই দুইয়ের মধ্যে যে কতখানি তফাৎ, তা হয়তো জীবনের এই ষাটের কোঠায় এসে আরও ভালো করে বুঝতে শিখেছি।
ছাত্রজীবনে সামান্য বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কোনো উল্লেখযোগ্য পদ-পদবির অলংকার আমার ভাগ্যে জোটেনি; কিন্তু সেই বয়সে রাজনীতির কিছু বই পড়েছিলাম, পৃথিবীর নানা দেশের নেতাদের জীবন ও সংগ্রামের কথা জানার চেষ্টা করেছিলাম। নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে মহাত্মা গান্ধী-মানুষের মুক্তি, রাষ্ট্রের চরিত্র এবং রাজনীতির নৈতিকতা নিয়ে যাঁরা তাঁদের জীবনকে প্রশ্নের মধ্যে নিক্ষেপ করেছিলেন, তাঁদের প্রতি এক ধরনের কৌতূহল ও শ্রদ্ধা জন্মেছিল।
গান্ধীর A Passage to India পড়ার সময়ও মনে হয়েছিল-দেশকে বুঝতে হলে শুধু তার মানচিত্র দেখলেই হয় না; তার মানুষের মুখ, দুঃখ, স্বপ্ন এবং ইতিহাসের ভাঁজগুলোও পড়তে হয়।
আমি কোনোদিন বড় রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম না। একজন নাগরিক হিসাবে দেশের রাজনীতিকে অনেকটা দূর থেকে দেখেছি, কখনো কখনো তার উত্তাল স্রোতে পা ভিজিয়েছি। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের বহু মিছিলে ছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার দরজায় যাওয়ার সিঁড়ি নয়—কখনো কখনো তা মানুষের বিবেকেরও মিছিল।
সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতন, গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রয়কার অভিঘাত আমাদের দেশের রাজনীতিতেও এসে পৌঁছেছিল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজন দেখেছি। কমরেড সাইফুদ্দিন মানিক ভাই গণফোরামে গেলেন, কমরেড নুরুল ইসলাম নাহিদ্ সহ আরেক অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হলো।
আমার সে সময়কার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলও পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন।
রাজনীতির পথ যে কত বিচিত্র, তার সাক্ষী সময় নিজেই।
কমরেড মণি সিংহের মৃত্যুর কথাও আজ মনে পড়ে। পল্টনের পার্টি অফিসের সামনে তাঁর মরদেহ রাখা হয়েছিল। ডাকসুর নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের বহু নেতা এসে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। সারাদিন আমরা সেখানে ছিলাম। পরে পোস্তগোলার শ্যামপুর মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য পর্যন্ত অন্যদের সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম।
তারপর আর কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা হয়নি। জীবন আমাকে রাজনীতির মঞ্চ থেকে সরিয়ে দিয়েছে; কিন্তু রাজনীতিকে দেখার চোখটি হয়তো পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারেনি।
এই দীর্ঘ সময়ের পর, হঠাৎ মুনিরুল চৌধুরী এমপিকে খুব কাছ থেকে দেখলাম।
আমি সবার পেছনে বসে তাঁর কথা শুনি। কোনো বিশেষ পরিচয়ের দাবি নিয়ে নয়—একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, একজন নীরব শ্রোতা হিসেবে।
কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, তাঁর কথার প্রতিটি শব্দ যেন আমার পুরোনো কোনো পড়া বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে বর্তমানের সঙ্গে কথা বলছে। তাঁর বক্তব্যে শুধু রাজনীতির ভাষা নেই; কোথাও যেন বিজ্ঞান, কোথাও দর্শন, কোথাও রাষ্ট্রচিন্তা, আবার কোথাও মানুষের প্রতি এক গভীর দায়বোধের স্পর্শ আছে।
আমার মনে হলো—রাজনীতি যদি সত্যিই মানুষের এবং রাষ্ট্রের কল্যাণের বিজ্ঞান হয়ে থাকে, তবে তার অন্তরে দর্শনেরও একটি নীরব আসন থাকা প্রয়োজন।
কারণ ক্ষমতা রাষ্ট্র চালাতে পারে, কিন্তু দর্শন মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়; আর প্রশ্নহীন রাজনীতি একদিন কেবল ক্ষমতার কৌশলে পরিণত হয়।
আজকের এই নষ্ট ও ক্লান্ত রাজনীতির আকাল-বাজারে দাঁড়িয়ে তাই এমন একজন মানুষকে কাছে থেকে দেখে আমার ভালো লাগে—যিনি রাজনীতিকে কেবল দল, পদ কিংবা নির্বাচনের অঙ্কে সীমাবদ্ধ না রেখে তার গভীরে মানুষ, রাষ্ট্র, ইতিহাস ও চিন্তার সম্পর্ককে স্পর্শ করতে চান।
আমি জানি না, আমার এই সামান্য লেখা কোনোদিন তাঁর চোখে পড়বে কি না। হয়তো পড়বে না। পড়ার প্রয়োজনও নেই।
আমি রাজনীতি করি না, করার ইচ্ছাও নেই। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দেওয়ার জন্যও এ লেখা নয়। এটি কেবল একজন ষাটের কোঠায় পৌঁছানো সাধারণ নাগরিকের নিজের দেখা, নিজের শোনা এবং নিজের ভিতরে জেগে ওঠা একটি অনুভূতির কথা মাত্র।
জীবনের পথে অনেক নেতা দেখেছি; অনেক বক্তৃতা শুনেছি; অনেক বড় নেতার বক্তৃতা আমার হুবহু মুখস্থ আছে ।
অনেক পতাকা উঠতে ও নামতে দেখেছি। কিন্তু খুব অল্প কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কথা শুনে মনে হয়—রাজনীতি এখনও সম্পূর্ণরূপে তার আত্মা হারিয়ে ফেলেনি।
মুনিরুল চৌধুরীকে দেখে আমার সেই বিশ্বাসটুকুই আবার জেগে উঠেছে।
রাষ্ট্রের চেয়ে মানুষ বড় নয়—কিন্তু মানুষের কল্যাণ ছাড়া রাষ্ট্রও অর্থহীন।
ক্ষমতার চেয়ে বড় পদ নয়—কিন্তু নীতিহীন ক্ষমতা মানুষ তথা রাষ্ট্রের জন্য অন্ধকার।
রাজনীতির শেষ কথা যদি মানুষই হয়, তবে সেই রাজনীতির প্রতি আমার আজও সামান্য শ্রদ্ধা আছে উনাকে দেখার পর।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মুনিরুল চৌধুরীর (এমপি) সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘ জীবন এবং চিন্তার এই আলোকিত পথ আরও দীর্ঘ হোক—এই আমার একান্ত ব্যক্তিগত কামনা।
এইটুকুই।